ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী পালিত হচ্ছে আজ

মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায় ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণের আহ্বান

স্টাফ রিপোর্টার,২৬ আগস্ট ২০২৬,নিউজ চ্যানেল বিডি

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল আজ। মহানবী (সা.)-এর জীবন, আদর্শ, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ স্মরণ করে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দেশে পালিত হচ্ছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আজ দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসাসহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আজ সংবাদপত্রের প্রকাশনাও বন্ধ রয়েছে।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করার পাশাপাশি তাওহিদ, ন্যায়, সত্য, দয়া, সহমর্মিতা ও মানবিক মর্যাদার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর প্রচারিত শান্তি, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী মানবসমাজে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে।

মহানবী (সা.) মক্কার কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের আগেই তাঁর বাবা আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সে তিনি মা আমিনা (রা.)-কেও হারান। এতিম অবস্থায় বেড়ে উঠলেও তাঁর চরিত্রে সততা, আমানতদারি, সংযম ও উত্তম নৈতিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠে। এ কারণে মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত ও আমানতদার হিসেবে অভিহিত করতেন।

মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন আরব সমাজ নানা ধরনের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত ছিল। পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার, গোত্রীয় সংঘাত, হিংসা, অন্যায় ও বৈষম্য সমাজজীবনে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহ তাঁকে মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেন।

চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় মহানবী (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। এর মধ্য দিয়ে তাঁর নবুওয়াতের দায়িত্ব শুরু হয়। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানান এবং মিথ্যা, জুলুম, শোষণ, অন্যায় ও বৈষম্য পরিহার করে ন্যায়, সততা, দয়া ও মানবিকতার পথে চলার শিক্ষা দেন।

মক্কার জীবনে মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের কঠিন নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। পরে আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। সেখানে তিনি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মদিনার সমাজব্যবস্থায় পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, সহাবস্থান, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রায় ২৩ বছর নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করে মহানবী (সা.) মানুষকে সত্য ও কল্যাণের পথে আহ্বান করেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মানুষের প্রতি দয়া, ক্ষমাশীলতা, সহিষ্ণুতা ও সহমর্মিতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। এতিম, দরিদ্র, অসহায়, নারী, শিশু ও সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ শুধু ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ন্যায়, সততা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষাও তাঁর আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হচ্ছে আজকের দিনেও।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাণী দিয়েছেন। তিনি মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার সময়ে মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন। তিনি মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল ও সহমর্মী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। পরিবার, প্রতিবেশী, নারী, শিশু এবং সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষকালব্যাপী কর্মসূচি

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পক্ষকালব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব সাহানে মঙ্গলবার বাদ মাগরিব এসব কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।

কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে মাহফিল ও সম্মেলন, সেমিনার, কবিতাপাঠ, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, প্রকাশনা ও প্রদর্শনী। এছাড়া জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ঐতিহ্যবাহী ইসলামি বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন মসজিদ, ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের উদ্যোগেও নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এসব আয়োজনে মহানবী (সা.)-এর জীবন, কর্ম, শিক্ষা ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

পবিত্র এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যক্তিজীবন ও সমাজে শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।