নিউজ চ্যানেল বিডি | বিশেষ প্রতিবেদন
বিদ্যুতের দাম বাড়লেই সরাসরি চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। বাড়ে বাসাবাড়ির বিল, বাড়ে শিল্পের উৎপাদন খরচ, প্রভাব পড়ে কৃষি ও ব্যবসায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রাহকের মিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে গিয়ে সেই বিদ্যুতের দামের সঙ্গে কত টাকা যোগ হয়? আর সেই টাকার কতটা যায় জ্বালানি, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, ক্যাপাসিটি চার্জ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায়?
সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
৩ জুন ২০২৬ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা BERC খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করে। অর্থাৎ গড়ে ইউনিটপ্রতি দাম বাড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বা ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। একই সঙ্গে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়। সঞ্চালন চার্জও বাড়ানো হয়।
তবে সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপ কিছুটা কমাতে পরদিন ০-৫০ ও ০-৭৫ ইউনিটের আবাসিক গ্রাহকদের বাড়তি মূল্য প্রত্যাহার করে আগের হার বহাল রাখা হয়। ফলে নতুন গড় খুচরা ট্যারিফ ১০ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে কমে ১০ টাকা ৪০ পয়সা হয়।
উৎপাদন খরচ থেকেই শুরু
বিদ্যুতের দামের মূল চাপ শুরু হয় উৎপাদন পর্যায় থেকেই।
সরকারের Power and Energy Sector Task Force-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে BPDB-এর নিজস্ব উৎপাদনে গড় খরচ ছিল প্রায় ৭ টাকা ৬০ পয়সা প্রতি ইউনিট।
কিন্তু একই সময়ে বেসরকারি IPP বা Independent Power Producer থেকে বিদ্যুৎ কেনার গড় খরচ ছিল প্রায় ১৪ টাকা ৬০ পয়সা।
অর্থাৎ একই এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে IPP থেকে কেনার গড় খরচ BPDB-এর নিজস্ব উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রায় ৭ টাকা বেশি।
আর এখানেই উঠে আসে বড় প্রশ্ন:
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কেন বিদ্যুৎ কিনতে এত বেশি খরচ হচ্ছে?
শুধু বিদ্যুৎ কিনলেই খরচ শেষ নয়
IPP থেকে বিদ্যুৎ কেনার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার জন্য দিতে হয় ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা ক্যাপাসিটি চার্জ।
সরকারের Task Force-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ৮২টি IPP ও ৩২টি Rental বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ ও সংশ্লিষ্ট অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেওয়া অর্থের বাইরে উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার জন্যও বিপুল অর্থ গুনতে হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়ে শুধু Summit Group-এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ছিল প্রায় ১৭ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। Aggreko International পেয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৩১০ কোটি, United Group প্রায় ৭ হাজার ৭৬০ কোটি এবং BCPCL প্রায় ৭ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা।
এই হিসাবগুলো এক বছরের নয়, ২০০৯ থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত সময়ের সম্মিলিত হিসাব।
জ্বালানি ও আমদানির চাপ
বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরেকটি বড় খরচ জ্বালানি।
গ্যাস, কয়লা, তেল ও LNG-এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ আমদানিও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের খরচ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয় সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচে প্রভাব ফেলে।
এমনকি ভারতের আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে দামের প্রশ্ন রয়েছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ আদানির বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিট প্রায় ১৪ টাকা ২ পয়সা দিয়েছে, যা ভারতের অন্যান্য উৎসের তুলনায় বেশি ছিল।
উৎপাদন থেকে গ্রাহকের মিটার পর্যন্ত
বিদ্যুৎ উৎপাদন বা আমদানির পরও খরচ শেষ হয় না।
বিদ্যুৎকে জাতীয় গ্রিডে আনতে লাগে সঞ্চালন ব্যবস্থা। এরপর বিতরণ কোম্পানির মাধ্যমে সেটি পৌঁছে যায় গ্রাহকের কাছে।
এই পুরো ব্যবস্থায় রয়েছে:
উৎপাদন ব্যয়
↓
IPP থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়
↓
ক্যাপাসিটি চার্জ
↓
জ্বালানি ব্যয়
↓
বিদ্যুৎ আমদানি
↓
সঞ্চালন ব্যয়
↓
Transmission Loss
↓
বিতরণ ব্যয়
↓
Distribution Loss
↓
গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল
অর্থাৎ গ্রাহকের মিটারে যে এক ইউনিট বিদ্যুৎ পৌঁছাচ্ছে, তার পেছনে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ নেই। প্রতিটি ধাপে যুক্ত হচ্ছে নতুন খরচ।
সিস্টেম লসও বড় প্রশ্ন
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কেনার পর পুরো বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় না। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় একটি অংশ হারিয়ে যায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের Transmission ও Distribution বা T&D system loss ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। সিস্টেম লসের পুরোটা বিদ্যুৎ চুরি নয়। এর মধ্যে কারিগরি ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্ক লস থাকে।
তারপরও প্রশ্ন থাকে:
এই ক্ষতির আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত কে বহন করছে?
খরচ বাড়লেও কেন কমছে না লোকসান?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই।
Task Force-এর হিসাবে BPDB-এর operating loss ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৬ হাজার ২০৮ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে সেই লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার ২৯১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে লোকসান কয়েক গুণ বেড়েছে।
অন্যদিকে বিদ্যুতের দামও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
২০০৯ সালে গড় খুচরা বিদ্যুতের দাম ছিল প্রায় ৩ টাকা ৬০ পয়সা। ২০২৪ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮ টাকা ৯৫ পয়সা।
অর্থাৎ প্রায় ১৫ বছরে গড় খুচরা ট্যারিফ প্রায় দেড় গুণেরও বেশি বেড়েছে।
তারপরও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের আর্থিক চাপ কাটেনি।
তাহলে ভর্তুকির টাকা কোথায় যাচ্ছে?
বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
অর্থাৎ একটি চক্র তৈরি হয়েছে:
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়ের খরচ বাড়ছে
↓
BPDB-এর লোকসান বাড়ছে
↓
সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে
↓
আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে
↓
বাড়তি খরচ যাচ্ছে গ্রাহকের পকেট থেকে
এই চক্র ভাঙা না গেলে শুধু বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আসল প্রশ্ন কোথায়?
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে তাই শুধু গ্রাহকের বিলের হিসাব দেখলে হবে না।
দেখতে হবে:
এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কত?
IPP থেকে একই বিদ্যুৎ কিনতে কত লাগে?
ক্যাপাসিটি চার্জে কত টাকা যাচ্ছে?
জ্বালানি আমদানিতে কত খরচ হচ্ছে?
বিদ্যুৎ আমদানিতে কত টাকা যাচ্ছে?
সঞ্চালন ও বিতরণে কত খরচ হচ্ছে?
সিস্টেম লসের কারণে কত বিদ্যুৎ ও অর্থ হারাচ্ছে?
আর সবশেষে গ্রাহকের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে?
কারণ বিদ্যুতের দাম বাড়ার হিসাব শুধু একটি ট্যারিফের হিসাব নয়।
এটি আসলে উৎপাদন থেকে গ্রাহকের মিটার পর্যন্ত কয়েক স্তরের অর্থের প্রবাহের হিসাব।
আর সেই হিসাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:
এক ইউনিট বিদ্যুতের জন্য গ্রাহক যে টাকা দিচ্ছেন, তার কতটা বিদ্যুতের পেছনে যাচ্ছে আর কতটা যাচ্ছে বিদ্যুৎ ব্যবসার বিভিন্ন স্তরে?
এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে, বিদ্যুতের দাম সত্যিই খরচের কারণে বাড়ছে, নাকি ব্যবস্থাপনার অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝাও শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ঘাড়ে চাপছে।





