বাইলাইন:
স্টাফ রিপোর্টার | নিউজ চ্যানেল বিডি, ঢাকা
বিদ্যুতের দাম বাড়লেই সবচেয়ে আগে বাড়ে সাধারণ মানুষের মাসিক খরচ। কিন্তু বিদ্যুতের উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রাহকের মিটার পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে কতটা বিদ্যুৎ হারাচ্ছে, সেই প্রশ্নও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কেনার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় বিদ্যুতের একটি অংশ হারিয়ে যাচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের Transmission and Distribution বা T&D system loss ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে এই পুরো ক্ষতিকে বিদ্যুৎ চুরি বলা যাবে না। এর মধ্যে কারিগরি ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্ক লস রয়েছে।
তবু অবৈধ সংযোগ, মিটার কারসাজি ও বিদ্যুৎ চুরির কারণে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা বন্ধ করা গেলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ কমানোর সুযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ চুরি কোথায় হচ্ছে, হিসাব হবে কীভাবে?
বিদ্যুৎ চুরি শনাক্তে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি হতে পারে ট্রান্সফরমারভিত্তিক বিদ্যুৎ হিসাব।
একটি নির্দিষ্ট ট্রান্সফরমার দিয়ে মোট কত ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়েছে, আর ওই এলাকার গ্রাহকদের মিটারে মোট কত ইউনিট ব্যবহার দেখানো হয়েছে, নিয়মিত সেই হিসাব মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।
যদি একটি ট্রান্সফরমারে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের পর গ্রাহকদের মোট বিলিংয়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যায়, তাহলে সেটি তদন্তের আওতায় আনা সম্ভব।
তবে ওই ঘাটতিকে সরাসরি চুরি বলা যাবে না। প্রথমে কারিগরি ক্ষতি, মিটার ত্রুটি, অবৈধ সংযোগসহ সম্ভাব্য সব কারণ যাচাই করতে হবে।
স্মার্ট মিটারেই কি কমবে চুরি?
প্রচলিত মিটারের পাশাপাশি স্মার্ট মিটারের ব্যবহার বাড়ানো বিদ্যুৎ চুরি শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্মার্ট মিটারে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায়। মিটার টেম্পারিং, অস্বাভাবিক লোড বা ব্যবহারের আকস্মিক পরিবর্তন শনাক্ত করা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
ফলে শুধু অভিযান চালিয়ে অবৈধ সংযোগ খোঁজার পরিবর্তে তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহজনক সংযোগ ও এলাকায় নজরদারি বাড়ানো সম্ভব হবে।
শুধু অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেই হবে না
বিদ্যুৎ চুরি বন্ধে শুধু অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দায় শেষ করলে হবে না।
কীভাবে সংযোগটি নেওয়া হলো, কে সংযোগ দিল, কোনো মিটার পরিবর্তন বা কারসাজিতে কারা জড়িত ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তরও বের করতে হবে।
কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সংযোগ চললে সংশ্লিষ্ট বিতরণ ব্যবস্থার নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তাই চুরির সঙ্গে জড়িত গ্রাহকের পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা মধ্যস্বত্বভোগী জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
‘হাই লস’ এলাকা চিহ্নিত করা জরুরি
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় যেসব ফিডার, ট্রান্সফরমার বা এলাকায় নিয়মিত অস্বাভাবিক লস হচ্ছে, সেগুলোকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
প্রতি মাসে এসব এলাকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে:
- কত ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়েছে
- কত ইউনিট বিল করা হয়েছে
- কত টাকা আদায় হয়েছে
- কত ইউনিট সিস্টেম লস হয়েছে
- কতটি অবৈধ সংযোগ পাওয়া গেছে
- আগের মাসের তুলনায় লস কতটা কমেছে
এভাবে তথ্যভিত্তিক নজরদারি চালানো গেলে বিদ্যুৎ চুরির প্রবণতা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
সিস্টেম লস আর বিদ্যুৎ চুরি এক নয়
বিদ্যুৎ চুরি নিয়ে আলোচনার সময় একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। সিস্টেম লসের পুরোটা বিদ্যুৎ চুরি নয়।
সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে বিদ্যুৎ পরিবহনের সময় কারিগরি ক্ষতি হয়। এর পাশাপাশি মিটার ত্রুটি, অবৈধ সংযোগ এবং অন্যান্য কারণে ক্ষতি হতে পারে।
তাই ৮ দশমিক ৯ শতাংশ T&D loss-এর পুরোটা বিদ্যুৎ চুরি হিসেবে প্রচার করলে তথ্যটি বিভ্রান্তিকর হবে।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত:
এই মোট লসের মধ্যে কারিগরি ক্ষতি কত, বাণিজ্যিক ক্ষতি কত এবং অবৈধভাবে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ কত?
এই তিনটি সংখ্যা আলাদা করে প্রকাশ করাই সবচেয়ে জরুরি।
বিদ্যুৎ চুরি বন্ধে কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহি
কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক সিস্টেম লস থাকলে শুধু গ্রাহকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়।
সংশ্লিষ্ট বিতরণ কর্মকর্তাদেরও ব্যাখ্যা দিতে হবে, কেন ওই এলাকায় লস কমছে না।
একই এলাকায় বারবার অবৈধ সংযোগ পাওয়া গেলে সেখানে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে দেখতে হবে, নজরদারিতে কোনো দুর্বলতা ছিল কি না।
চুরি বন্ধ হলে লাভ কার?
বিদ্যুৎ চুরি ও অস্বাভাবিক সিস্টেম লস কমানো গেলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার অপচয় কমবে। এতে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর আর্থিক চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বিদ্যুতের দাম কমানোর একমাত্র সমাধান হিসেবে চুরি বন্ধকে দেখার সুযোগ নেই। বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে উৎপাদন খরচ, জ্বালানি, IPP থেকে বিদ্যুৎ কেনা, ক্যাপাসিটি চার্জ, বিদ্যুৎ আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয়সহ পুরো ব্যবস্থার হিসাব বিবেচনায় আসে।
তাই চুরি বন্ধের পাশাপাশি উৎপাদন ও ক্রয় ব্যবস্থার ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সমাধান কোথায়?
বিদ্যুৎ চুরি বন্ধে একক কোনো পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থা।
স্মার্ট মিটার
ট্রান্সফরমারভিত্তিক হিসাব
ডিজিটাল মনিটরিং
হাই-লস এলাকার নিয়মিত অডিট
মিটার টেম্পারিং শনাক্তকরণ
অবৈধ সংযোগের সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
বিতরণ কর্মকর্তাদের জবাবদিহি
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের হিসাব স্বচ্ছ করা।
একটি ট্রান্সফরমারে কত বিদ্যুৎ ঢুকল, গ্রাহকের মিটারে কত গেল এবং মাঝখানে কত ইউনিটের ঘাটতি হলো, এই হিসাব যদি নিয়মিত প্রকাশ ও যাচাই করা যায়, তাহলে বিদ্যুৎ চুরি শনাক্ত করা যেমন সহজ হবে, তেমনি কোথায় কারিগরি ক্ষতি বেশি সেটিও স্পষ্ট হবে।
কারণ প্রশ্ন শুধু বিদ্যুতের দাম কত হলো, তা নয়।
প্রশ্ন হলো:





