ঢাকা, ১৩ নভেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার:
জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ঐতিহাসিক ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর অনুমোদন ঘোষণা করেছেন। আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
ভাষণের শুরুতেই প্রধান উপদেষ্টা বলেন,
“গত বছর আগস্ট মাসে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিবলে আমরা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছিলাম। এখন আমরা দায়িত্ব পালনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।”
তিনি জানান, সরকারের প্রধান তিন দায়িত্ব—
১️⃣ জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার,
২️⃣ গণতান্ত্রিক সংস্কার, এবং
৩️⃣ সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন—এর বাস্তবায়নেই সরকার মনোযোগ দিয়েছে।
বিচার ও সংস্কারে অগ্রগতি
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় প্রকাশের অপেক্ষায়, আর কয়েকটি মামলা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি আরও জানান—
“দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমরা গুমের মতো নৃশংস অপরাধের বিচার শুরু করেছি।”
সংস্কারের ক্ষেত্রে উল্লেখ করে বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা, দুর্নীতি দমন, ডিজিটালাইজেশন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সংস্কার ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ভূমিকা ও জুলাই সনদ
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নয় মাসের আলাপ-আলোচনার পর জুলাই সনদ নামে একটি ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার দলিল প্রণয়ন করেছে, যেখানে ৩০টি সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবনায় রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন,
“জুলাই সনদ আমাদের ঐক্যের প্রতীক। মতভেদ যতটা মনে হয়, বাস্তবে তা তত গভীর নয়।”
অন্তর্বর্তী সরকার ঐকমত্য কমিশনের দলিলের ভিত্তিতেই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করেছে, যা এখন গেজেট নোটিফিকেশনের পর্যায়ে।
গণভোট ও নির্বাচনের দিন একই
ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন—
“আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এতে নির্বাচন আরও উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে।”
গণভোটে চারটি মূল প্রস্তাব উপস্থাপিত হবে—
১️⃣ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন জুলাই সনদ অনুযায়ী গঠন,
২️⃣ দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ,
৩️⃣ নারী প্রতিনিধিত্ব, ডেপুটি স্পিকার বিরোধীদল থেকে, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি,
৪️⃣ অন্য সংস্কারসমূহ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন।
গণভোটে জনগণ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে মতামত জানাবেন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন
‘হ্যাঁ’ ভোট পেলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়েই একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা ১৮০ কার্যদিবসে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ (Upper House) গঠন করা হবে।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক অগ্রগতি
প্রধান উপদেষ্টা জানান,
“অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতিকে গভীর গহ্বর থেকে টেনে তোলা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা তা সফলভাবে পার করেছি।”
তিনি বলেন, বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) ১৯.১৩% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শিগগিরই ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস বি.ভি.-এর সঙ্গে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চুক্তি স্বাক্ষর হবে — যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ইউরোপীয় বিনিয়োগ।
ঐক্যের আহ্বান
ভাষণের শেষাংশে প্রধান উপদেষ্টা দেশের সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন,
“২০২৪-এর জুলাইয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা যে ঐক্য গড়েছিলাম, অল্পস্বল্প মতভেদে তার মর্যাদা যেন ক্ষুণ্ণ না হয়।”
তিনি শহীদদের স্মরণ করে বলেন,
“১৩৩ শিশু, শত শত তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষের আত্মত্যাগ আমাদের পথ দেখায়। দলীয় স্বার্থ অতিক্রম করে জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে।”
ভাষণ শেষে তিনি বলেন—
“আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আল্লাহ হাফেজ।”





