কাল থেকে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে: প্রধানমন্ত্রী

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাইলেন তারেক রহমান

স্টাফ রিপোর্টার | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি

শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ আগামীকাল থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবাইকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি থেকে বিরত থেকে সরকারের মেয়াদে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানান।

আজ সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তিন ঘণ্টাব্যাপী মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু এ তথ্য জানান।

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

সভায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

প্রধানমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার সমস্যা চিহ্নিত করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এখন সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা

বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আগামীকাল সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে।’

ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জিটুজি ভিত্তিতে গত এক মাসে আরেকটি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুতই কাজ শুরু হবে।

সরকার আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালকে সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা সমাধানেও পরিকল্পনা

বিদ্যুৎ খাতের সমস্যাও দীর্ঘদিনের বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করেছে, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেছে এবং সেগুলো সমাধানে পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এখন তা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সময় লাগে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের বর্তমান সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। চাইলেই ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে এর সমাধান করা সম্ভব নয়।

সরকার কোন কাজ কখন শেষ করতে চায়, তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও সভায় ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সরকারের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।

এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।

পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতার আহ্বান

হতাশ হওয়ার কারণ নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সমস্যার ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আগে থেকেই অবগত। সরকার সমস্যাগুলো আড়াল না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে কীভাবে সেগুলোর সমাধান করতে চায়, সেটিও জানিয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে শুধু ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নয়, পুরো দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।

দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণই সময়মতো ঠিক করবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। তবে যে সময় যে সরকার দায়িত্বে থাকে, তাকে তার পরিকল্পিত কাজগুলো সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া উচিত।

গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

গণমাধ্যমকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেলে তা দেশবাসীর কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বড় কোনো কাজ সফলভাবে করতে একটি কার্যকর দল প্রয়োজন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন, যাতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।

ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা আপনাদের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারি।’

বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন

সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এবং জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক উপস্থিত ছিলেন।

ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক এবং বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনামসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ইংরেজি দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহরিন ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।