মৎস্য, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাড়াতে জলাশয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

জলাশয় সংস্কার করে বেকার তরুণদের মধ্যে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে

স্টাফ রিপোর্টার | ১৬ আগস্ট ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি

কিশোরগঞ্জ: মৎস্য খাতকে আরও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন বাজার খুঁজে বের করার জন্য দেশের উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রোববার কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউটের মিনি স্টেডিয়ামে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বহু নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও হাওর বর্তমানে অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। সরকার এসব জলাশয় সংস্কার করে সেখানে মাছের পোনা ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার বেকার তরুণদের মধ্যে এসব জলাশয় ব্যবহারের সুযোগ বণ্টন করা হবে, যাতে তারা কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পান।

তিনি বলেন, মৎস্য সম্পদ রক্ষায় হাওর ও জলাশয়ের পরিবেশ সুরক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। মাছকে বাঁচাতে হলে পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদও সমৃদ্ধ করা সম্ভব হবে।

জলাশয় দূষণের বিষয়ে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা, টিস্যু পেপার ও প্লাস্টিকের বোতল পানিতে ফেলার কারণে খাল-বিল, নদী-নালা ও হাওর-জলাশয়ের পরিবেশ ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে। পরিবার, পরিবেশ, মাছ ও পানি রক্ষা এবং দূষণ রোধে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

মৎস্য খাতের সাফল্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বের প্রায় ৫২টি দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট জলজ প্রাণী উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম এবং অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, খুলনা অঞ্চলে ৩০০টি ক্লাস্টার গঠনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৭ হাজার ৫০০টি ঘেরে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৭ হাজার একর জমিতে ‘শ্রিম্প সিটি’ বাস্তবায়নে মাস্টারপ্ল্যান ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে।

ইলিশ উৎপাদনের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ, যা জাতীয় জিডিপির ১ শতাংশেরও বেশি। বিগত বিএনপি সরকারের সময় প্রবর্তিত ‘ইলিশ ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’-এর ধারাবাহিকতায় দেশে ইলিশ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মৎস্যজীবী ও জেলেদের সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। মৎস্য চাষিদের কৃষক কার্ড প্রদান এবং জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলে মাছ ধরার নিষিদ্ধকালীন সময়ে জেলেদের ভিজিএফ সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে সরকার ৫০০ কোটি টাকার ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ গঠন করেছে। এ ফান্ড থেকে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের শিল্প শুরু বা সম্প্রসারণের জন্য ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের এ সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত জুনে নাইজেরিয়ায় হ্যাচিং ডিম রপ্তানি করা হয়েছে। বিদেশে নতুন নতুন পণ্যের বাজার খুঁজে বের করতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে।

অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিন উর রশীদের সভাপতিত্বে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জালাল উদ্দীন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব দেলোয়ার হোসেন এবং মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. খালেদ কনক বক্তব্য দেন।

এবারের জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের প্রতিপাদ্য— ‘রুপালী মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ১৩টি ক্যাটাগরিতে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণ পদক) প্রদান করেন।

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী শোলাকিয়া মাঠে বৃক্ষরোপণ এবং কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।