স্টাফ রিপোর্টার,২৮ আগস্ট ২০২৬,নিউজ চ্যানেল বিডি
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯২ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপ ও কাদার মধ্যে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমশীতল পানি ও কাদার স্রোত সুনামির মতো ধেয়ে এসে শহর ও জনপদ তছনছ করে দিয়েছে। কাদার তোড়ে ঘরবাড়ি ডুবে গেছে, সেতু ও বাঁধ ভেঙে পড়েছে এবং ভেসে গেছে বহু যানবাহন। পুরোপুরি ভেসে গেছে বেশ কয়েকটি গ্রাম।
নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন। নেপালে ভ্রমণে যাওয়া ট্রেকারদের পাশাপাশি তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া বহু হিন্দু তীর্থযাত্রীও নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ৩৮৯টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। দেশটিতে আরও ৯১০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি পর্যটক। ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ৯০ জন নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
এদিকে বেইজিং জানিয়েছে, নেপালে থাকা ১০০ জন চীনা নাগরিকেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এই সংখ্যা ৯১০ নিখোঁজের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং বন্দরে ভূমিধসজনিত দুর্যোগে তিনজন নিহত হয়েছেন। সেখানে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বৃহস্পতিবার ওই এলাকা পরিদর্শন করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম তদারক করেন।
হিমবাহ ধস থেকে দুর্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, একটি হিমবাহ ধসে পড়ার কারণে এ দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। প্রথমে ঘটনাটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করা হলেও ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের পর এটিকে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। ফলে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের বন্যা ও হিমবাহ ধসের ঝুঁকি বাড়ছে।
এখনো আরও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে উপত্যকার কিছু অংশ আটকে যাওয়ায় সেখানে পানি জমে আছে। নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ বৃহস্পতিবার বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং বলেন, নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনো বড় ধরনের বাধা রয়েছে। এর ফলে দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে।
উদ্ধার তৎপরতা
দুর্গত এলাকায় জীবিতদের উদ্ধারে দ্রুত কাজ করছে উদ্ধারকারী দলগুলো। নেপালের সেনারা প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মরদেহের সন্ধান চালাচ্ছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে প্রায় ৮০০ জরুরি উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষিত কুকুর ও স্পিডবোট মোতায়েন করা হয়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দুর্যোগের পর দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিত এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়কগুলো খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
পরিবেশ-ইতিহাসবিদ ও অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুথ গ্যাম্বল আকস্মিক কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতকে ‘অভ্যন্তরীণ সুনামি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, এ স্রোত নেপালের ভেতরে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্যোগে প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করে দালাই লামা নিহতদের জন্য প্রার্থনা করার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ভারতীয় আধ্যাত্মিক নেতা সদগুরু জানিয়েছেন, কৈলাস পর্বত থেকে ফেরার পথে বহু হিন্দু তীর্থযাত্রী বন্যার কবলে পড়েছেন।
তিনি ঘটনাটিকে ‘ভয়াবহ এবং নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন।





