স্টাফ রিপোর্টার | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর ছয় আসামি হলেন—কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
রায়ে বলা হয়েছে, সব আসামি পলাতক রয়েছেন।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ
রায়ে বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নিহত ও আহত ব্যক্তি অথবা তাদের পরিবারকে জুলাই ফাউন্ডেশন কিংবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র কর্মীদের মাধ্যমে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলা, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরের বিভিন্ন বক্তব্য, নির্দেশনা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরা হয়। ১১ জুলাই ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে তার ফোনালাপ এবং ১৫ জুলাই আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বানের বিষয়ও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
১৬ জুলাই ইন্টারনেটের গতি কমানো এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়।
এছাড়া ১৭ ও ১৮ জুলাই দলীয় নেতাকর্মীদের আন্দোলন প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ এবং ১৯ জুলাই কারফিউ ও ‘শুট অ্যাট সাইট’ প্রসঙ্গেও তার বক্তব্য অভিযোগে তুলে ধরা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এতে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হওয়ার অভিযোগ করা হয়।
বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ
আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তার নির্বাচনী এলাকা ও এর আশপাশে আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ছিল।
মামলার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ও মাদারীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার নির্দেশনা, প্ররোচনা ও তদারকির বিষয় তুলে ধরা হয়।
৪ ও ৫ আগস্ট রাজধানীর বিভিন্ন স্থানেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়।
মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের উসকানি দেওয়া, হামলার নির্দেশ এবং আন্দোলনের সংবাদ প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ১৩ ও ১৪ জুলাই তিনি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তব্য দেন। ১৯ জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়ে বক্তব্য দেন।
আন্দোলন দমনের সময় কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকার কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে অভিযোগ
যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তিনি আন্দোলন দমনে যুবলীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত ও নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেন।
অভিযোগে চট্টগ্রাম, মহাখালী, লক্ষ্মীপুর ও রাজশাহীতে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়।
মাইনুল হোসেন খান নিখিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন প্রতিহত করতে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ এবং মিরপুরে নিজে উপস্থিত থেকে হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ১৯ জুলাই মিরপুরে তার নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় গুলিবর্ষণ ও হামলার ঘটনায় বহু আন্দোলনকারী নিহত হন। ৪ ও ৫ আগস্টও মিরপুরে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে।
সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের হুমকি ও উসকানি দেওয়া এবং সংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্দোলন দমনে ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়।
১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে দেওয়া বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার আহ্বান তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের অন্যতম ভিত্তি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে পরিকল্পনা, নির্দেশনা, উসকানি ও হামলার তদারকির অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ১৩ জুলাই মধুর ক্যান্টিনে তিনি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন এবং ১৫ জুলাই আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশ দেন।
১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দাম হোসেনের দেওয়া বক্তব্যকে সমর্থন এবং পরবর্তী সময়ে আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ভূমিকা সমন্বয়ের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।
মামলার আগের রায়
এদিকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর প্রথম রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।





