✮
✮
✮
✮
✮
✮
✮
✮
✮
✮
✮
✮
✮
✮
✮

একটি ছুটি, এক জীবনের দুঃস্বপ্ন: ইনানীর রিসোর্টে আগুনে নিভে গেল ছয় প্রাণ

কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্বজন হারানোর শোক, নিরাপত্তাহীন পর্যটনকেন্দ্র নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

স্টাফ রিপোর্টার | ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি

কক্সবাজার: একটি ছুটি, কিছু আনন্দের মুহূর্ত আর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানোর প্রত্যাশা—সবকিছু মুহূর্তেই বদলে গেল এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতের টুপটুপ রিসোর্টে আগুন কেড়ে নিল আশিকুল ইসলামের স্ত্রীসহ পরিবারের ছয়জনের প্রাণ। আগুন থেকে বাঁচতে দোতলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রিয়জনদের হারানোর অসহনীয় শোক নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন আশিকুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, স্ত্রীর ছোট বোন লায়লা জাহান নাবিলাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। যে ভ্রমণ হওয়ার কথা ছিল আনন্দ আর স্মৃতিতে ভরা, সেই ভ্রমণই এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায়।

একই অগ্নিকাণ্ডে বান্ধবীদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন দেওয়ান ফয়সালের স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯)। স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় লিখেছিলেন, ‘হে আরশে আজিমের মালিক, আমাদের সব ভাবনা যেন ভুল হয়। আমি ওরে ছাড়া থাকমু কেমনে।’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা শেষ হলো এক নির্মম বাস্তবতায়। ফয়সালের এই আর্তনাদ যেন স্বজন হারানো প্রতিটি পরিবারের বেদনারই প্রতিচ্ছবি।

এই অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তাঁরা হলেন—ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। আহত ও দগ্ধ ছয়জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে জানানো হয়েছে। উদ্ধার অভিযানও চলছিল।

এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও সামনে এনেছে দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কক্সবাজার, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাঠ, বাঁশ ও গাছের ডালপালা দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের রিসোর্ট। আকর্ষণীয় নকশা আর শৈল্পিক নাম দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা হলেও এসব স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

পর্যটন ব্যবসার প্রসার অবশ্যই প্রয়োজন। তবে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনোভাবেই পর্যটন ব্যবসা পরিচালনা করা উচিত নয়। প্রতিটি রিসোর্টে কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নিরাপদ বের হওয়ার পথ, জরুরি নির্দেশনা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।

এ ধরনের দুর্ঘটনার পর প্রায়ই তদন্ত কমিটি গঠন, প্রতিবেদন তৈরি এবং সাময়িক অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ দেখা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যদি সেই তৎপরতা স্তিমিত হয়ে পড়ে, তাহলে একই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি থেকেই যায়। নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়মিত তদারকি এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে প্রশাসনিক তদন্ত কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার সংস্কারের বাইরেও রয়েছে এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি। যাঁরা স্ত্রী, সন্তান, ভাই কিংবা বোনকে হারিয়েছেন, তাঁদের জীবনে আর কিছুই আগের মতো থাকবে না।

আশিকুল ইসলাম কীভাবে ফিরবেন ঢাকায়? কীভাবে কাটাবেন বাকি জীবন? যাঁদের সঙ্গে নিয়ে আনন্দের ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন, তাঁদের ছাড়াই কীভাবে ফিরবেন নিজের ঘরে? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো সহজে মিলবে না।

তদন্ত প্রতিবেদন একদিন লেখা শেষ হবে, ঘটনার খবরও হয়তো সময়ের সঙ্গে মানুষের স্মৃতি থেকে ম্লান হয়ে যাবে। কিন্তু স্বজন হারানোর যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন।

একটি ছুটি শেষ হয়েছে। কিন্তু রেখে গেছে এমন এক দুঃস্বপ্ন, যার শেষ নেই।