রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দ্রুত ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি মিয়ানমারে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিতের আহ্বান

স্টাফ রিপোর্টার | ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিশ্ব সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোরালো সহযোগিতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

শনিবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কোঅপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপনসিবিলিটিজ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি যেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক রাডারে সর্বদা সক্রিয় থাকে এবং অন্য কোনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংঘাত বা সংকটের আড়ালে চাপা পড়ে না যায়।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কার্যকর কূটনীতির আহ্বান

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্ব রাজনীতির নেতৃস্থানীয় দেশসমূহ এবং জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এ সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান সম্ভব। তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য একটাই—আশ্রিত বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারা। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহায়তা এবং নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।”

দীর্ঘমেয়াদি সংকটে বাড়ছে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ

সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় জীবনধারণের মৌলিক নিরাপত্তা দিয়ে আসছে।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব কার্যক্রম বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ক্যাম্প সংলগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও পরিবেশও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পের চারপাশে সীমান্ত বেড়া এবং সুনিয়ন্ত্রিত যাতায়াত ব্যবস্থার মতো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।

অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এবং ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কূটনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশ সফলভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করেছিল।

অতীতের সেই সফল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার আবারও শতভাগ সফল প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ইতোমধ্যে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর্মুলেশন কমিটি অন রোহিঙ্গা অ্যাফেয়ার্স’ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক সমন্বয়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটিও সক্রিয় রয়েছে।

তিনি বলেন, বেসামরিক প্রশাসন, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে সরকার একটি সর্বাত্মক ‘হোল-অব-গভর্নমেন্ট’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে।

প্রয়োজন রূপান্তরকালীন কৌশল

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা ছাড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমাধানের তাগিদ কমে যেতে পারে।

তিনি বলেন, জরুরি ত্রাণ সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে দ্রুত একটি ‘ট্রানজিশনাল স্ট্র্যাটেজি’ বা রূপান্তরকালীন কৌশলে যেতে হবে, যার মূল লক্ষ্য হবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা।

সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, টেকসই আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ, জাতীয় ঐক্য এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর সমন্বয়ে বাংলাদেশ দ্রুতই রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনে সক্ষম হবে।

অনুষ্ঠানে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রশাসনিক সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

আইজিসিএফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আদনান রহমানের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে গোলটেবিল আলোচনা শুরু হয়। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী।

গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি আইভো ফ্রেইসেন, বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।