সাগর-রুনি হত্যা মামলায় নাটকীয় মোড়, জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ

পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি একটি ডকুমেন্টারিকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডে নতুন তথ্য পাওয়ার দাবি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সংশ্লিষ্ট সূত্রের

স্টাফ রিপোর্টার | ৩১ আগস্ট ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সেনাবাহিনীর বরখাস্ত কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং অভিনেত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য রোকেয়া প্রাচীর সম্পৃক্ততার তথ্য তদন্ত ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রসিকিউশন সূত্রের বরাতে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের আগে পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিলেন সাগর-রুনি দম্পতি। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ডকুমেন্টারি প্রকাশের আগেই তাদের হত্যা করা হয় এবং ডকুমেন্টারিসংশ্লিষ্ট উপকরণ দখলে নেওয়া হয়।

তদন্ত ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তার বরাতে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি গুমের ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে র‌্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা শাখার প্রধান জিয়াউল আহসানের সঙ্গে রোকেয়া প্রাচীর বিশ বারের বেশি ফোনালাপের তথ্য পাওয়া গেছে।

ওই কথোপকথনের বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর জিয়াউল আহসান তার এক বিশ্বস্ত সহকারীকে রোকেয়া প্রাচীর কাছে পাঠান বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এ সময় রোকেয়া প্রাচীর কাছ থেকে ল্যাপটপে ব্যবহৃত দুটি পেনড্রাইভ নেওয়া হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দাবি, ওই দুটি পেনড্রাইভে পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি একটি ডকুমেন্টারি ছিল। তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে যে, সাগর ও রুনিকে হত্যার পর পেনড্রাইভ দুটি জিয়াউল আহসান যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোকেয়া প্রাচীর কাছে দিয়েছিলেন এবং দুই দিন পর তা ফেরত নেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউশন টিম জিয়াউল আহসানের ওই সহকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন বলে ট্রাইবুনালের এক কর্মকর্তার বরাতে গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।

দীর্ঘ ১৪ বছরের তদন্তেও রহস্য উদঘাটন হয়নি

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।

প্রথমে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। চার দিন পর তদন্তভার দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। দুই মাসের বেশি সময় তদন্ত করেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় হাইকোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল তদন্তভার র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

দীর্ঘ সময় র‌্যাবের তদন্তেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট মামলাটির তদন্ত থেকে র‌্যাবকে সরিয়ে দেয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের নির্দেশের পর ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে। পিবিআই প্রধানকে ওই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক করা হয়। বর্তমানে টাস্কফোর্সের অধীনেই মামলাটির তদন্ত চলছে।

তবে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হওয়ায় টাস্কফোর্সকে কয়েক দফায় সময় দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল হাইকোর্ট আরও ছয় মাস সময় দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলার তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এখন পর্যন্ত মোট ১২৯ বার পিছিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল

এ মামলায় বিভিন্ন সময়ে যাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে তারা হলেন, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাসার দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তানভীর রহমান খান।

তানভীর রহমান খান বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। পলাশ রুদ্র পালও জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর পলাতক রয়েছেন। অন্য আসামিরা কারাগারে আছেন।

উল্লেখ্য, জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো তদন্ত ও অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রের তথ্য এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

সূত্র: ডেইলি ওয়াদা, আমার দেশ