স্টাফ রিপোর্টার | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা রোধ, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং জনপরিসরে নৈতিক অবক্ষয়মূলক কনটেন্ট প্রতিরোধই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান।
তিনি বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই মুক্তচিন্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকদের দমনের উদ্দেশ্যে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সতর্ক সরকার
তথ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমকে দমিয়ে রাখার প্রবণতা ছিল। গণমাধ্যমের ওপর আইনের অপব্যবহারের বিষয়টি বর্তমান সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
তিনি বলেন, খসড়া আইনে যেন এমন কোনো দ্ব্যর্থবোধক শব্দ না থাকে, যা ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের ওপর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে, সে জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আইনটি পরিমার্জন করা হচ্ছে।
অশালীন কনটেন্ট ও সাইবার বুলিং বন্ধে উদ্যোগ
আন্দালিভ রহমান বলেন, বাকস্বাধীনতার নামে বিভিন্ন অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন গালিগালাজ, সাইবার বুলিং ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড সামাজিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সামাজিক অবক্ষয় রোধ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার বিষয় দুটিকে কোনো ধরনের সংঘাত ছাড়াই কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
শুধু আইন করে সাইবার অপরাধ দমন সম্ভব নয়
আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, কেবল কঠিন আইন করে সব অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়।
সাইবার স্পেসে সত্যতা যাচাই না করে মানহানিকর কোনো তথ্য বা পোস্ট শেয়ার করাও অপরাধের আওতায় পড়তে পারে—এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এর আগে পরামর্শ সভার সূচনা বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী বলেন, সাইবার সুরক্ষা সংশোধন আইন চূড়ান্ত করার আগে তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতামত প্রকাশের সুরক্ষার স্বার্থে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ ও মতামত নেওয়া অপরিহার্য।
আইন অপব্যবহার না করার আশ্বাস
গণমাধ্যম সম্পাদকদের আশ্বস্ত করে আন্দালিভ রহমান বলেন, কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার আইনটি সংশোধন করছে না। প্রিন্ট মিডিয়ার এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
আইনের কোথাও অস্পষ্টতা বা জটিলতা থাকলে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মুক্তমনে পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
সাইবার অপরাধ বেড়েছে বিশ্বজুড়ে
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাইবার সিকিউরিটি আইনের সংশোধন প্রয়োজন। আইনটির যেন অপব্যবহার না হয়, সে লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশেও অনলাইন জালিয়াতি, সেক্সটোরশন, নারীদের ব্ল্যাকমেইলিং এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো অপরাধ প্রতিরোধে একটি যুগোপযোগী আইনের বিকল্প নেই।
তবে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে আইনটি পরিমার্জনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অংশীজনদের মতামত গ্রহণ
সভায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরীসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতা, ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার সম্পাদক এবং সংশ্লিষ্টরা মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে তাদের মতামত দেন।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, বিগত সরকারের আমলে প্রণীত নিপীড়নমূলক আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল ও সংশোধন করে বর্তমান সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক অগ্রগতি।
তিনি বলেন, বাকস্বাধীনতার নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসভ্যতা এবং ভুয়া আইডি ব্যবহার করে নারী, শিশু ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হয়রানি কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হতে পারে না। তবে আইনের পাশাপাশি সরকারি কোনো সংস্থা নাগরিকদের সাইবার অধিকার লঙ্ঘন করলে তাদের জবাবদিহির বিধানও আইনে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
সভাটি সঞ্চালনা করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা। সভায় সাইবার সুরক্ষা (সংশোধিত) আইন, ২০২৬-এর খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করেন জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক ড. মো. তৈয়বুর রহমান।





