বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান ও সংগ্রাম

দুইবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আপোষহীন নেত্রী থেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম— বিএনপি চেয়ারপারসনের জীবনপথ

স্টাফ রিপোর্টার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫, নিউজ চ্যানেল বিডি।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন। গণতন্ত্র, ক্ষমতার পালাবদল এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতীক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রাথমিক জীবন ও পরিবার

খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলায়। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পরিবার-পরিজন ও পড়াশোনার মধ্য দিয়ে।

১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হন।

খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের দুই পুত্র – তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান (কোকো)। তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, আর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো প্রয়াত।

রাজনীতিতে প্রবেশ

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না; তিনি মূলত একজন গৃহবধূ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি বড় ধরনের নেতৃত্বশূন্যতায় পড়ে। দলের নেতাকর্মীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে শুরু করেন।

১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া সক্রিয় ভূমিকা রাখতে থাকেন। ১৯৮৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

আপোষহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি

সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে প্রায় নয় বছর দীর্ঘ গণআন্দোলনে তাঁর অনড় অবস্থান, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে বারবার প্রতিবাদে রাজপথে নামা এবং আপোষহীন রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি সমর্থকদের কাছে “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবে পরিচিতি পান। এই সময় তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য গড়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব দেন।

প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীত্ব (১৯৯১–১৯৯৬)

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

তাঁর এই মেয়াদে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়। এ সময় রাজনৈতিক কাঠামো ও সংবিধানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আসে, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা (২০০১–২০০৬)

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন।

এ সময় দেশ পরিচালনা, জোট রাজনীতি, সন্ত্রাসবাদ ইস্যু, দুর্নীতির অভিযোগসহ নানা প্রসঙ্গে তাঁর সরকার সমালোচিত ও আলোচিত হয়। একই সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকতায় ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও অর্থনীতির কিছু খাতে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডও চালানো হয়—যা নিয়ে সমর্থক ও সমালোচক উভয় পক্ষেরই ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মামলার জটিলতা

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাথে বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের প্রধান দুই ধারা রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ দুই নেত্রীর বিরোধ, আন্দোলন-সংগ্রাম, hartal এবং নির্বাচনী রাজনীতি দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র নির্ধারণ করেছে।

২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এবং পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে অন্য মামলাতেও তাঁর সাজা হয়।

স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও বর্তমান অবস্থা

কারাগারে থাকা অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। দলীয় ও পারিবারিকভাবে অসংখ্য চেষ্টা-তদবির সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে পূর্ববর্তী সরকার অনুমতি দেয়নি বলে অভিযোগ করে আসছিল তাঁর পরিবার ও রাজনৈতিক দল।

৫ই আগস্ট ২০২৪ সালে ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং মুক্ত হন বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব নেয়া বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা, দল ও পরিবারের অব্যাহত প্রচেষ্টায় তাঁকে লন্ডনের একটি হাসপাতালে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানো হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়ার পর আগের তুলনায় কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশেও ফিরে আসেন তিনি।

দেশে ফেরার পর সর্বশেষ সেনাকুঞ্জে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বেগম খালেদা জিয়া সবার সঙ্গে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করেন। অনেক দিন পর তাঁকে তুলনামূলক সুস্থ ও প্রাণবন্ত দেখে দলীয় নেতা–কর্মী এবং সমর্থকদের মাঝে আশার সঞ্চার হয়।

তবে ঠিক সেই উজ্জ্বল উপস্থিতির দুদিন পরেই হঠাৎ অসুস্থ বোধ করতে থাকেন বিএনপি চেয়ারপারসন। দ্রুত তাঁকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তাঁকে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

গতকাল শুক্রবার দেশব্যাপী মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উন্নতি ও দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়। বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত দোয়া মাহফিল, মিলাদ ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ।

রাজধানীতে আয়োজিত এক দোয়া মাহফিল ও মোনাজাত শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেন, “আমাদের নেত্রী বর্তমানে আইসিইউ–সমমানের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। চিকিৎসক টিম সব সময় তাঁর পাশে রয়েছে। আমরা আশাবাদী, আল্লাহর অশেষ রহমত এবং সবার দোয়ায় তিনি আরও সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে আগের মতো ফিরে আসবেন।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা দেশবাসীর কাছে অনুরোধ করেছি, নেত্রীর সুস্থতার জন্য দোয়া চালিয়ে যেতে। জনগণের ভালোবাসা এবং দোয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। নেত্রীর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এই দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে উৎসর্গিত—আল্লাহ তায়ালা যেন তাঁকে দ্রুত আরোগ্য দান করেন।”

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনগুলো মানববন্ধন, কোরআনখানি, মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় বহু পোস্ট, প্রার্থনা ও সংহতির বার্তা প্রচার হতে দেখা যায়।