মহান বিজয় দিবস ২০২৫ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ

সংস্কার, বিচার, নির্বাচন ও নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা

স্টাফ রিপোর্টার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, নিউজ চ্যানেল বিডি।

মহান বিজয় দিবস ২০২৫ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা। ভাষণের শুরুতে তিনি দেশবাসীসহ দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সকল বাংলাদেশিকে বিজয়ের শুভেচ্ছা ও আন্তরিক সালাম জানান।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই বিজয় লাখো শহিদের আত্মত্যাগে অর্জিত, যা জাতির ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

প্রধান উপদেষ্টা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী সকল বীর শহিদ ও যোদ্ধাদের স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায় এবং সংকটকালে মুক্তির পথ দেখায়।

ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে যে স্বাধীনতার সূচনা হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের কারণে ম্লান হয়ে পড়ে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের সুযোগ পেয়েছে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি উন্নত ও সুশাসিত বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলতে বিস্তৃত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এবং জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণে সেই কর্মসূচির সফল পরিসমাপ্তির পথে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

ভাষণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর সাম্প্রতিক হামলা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ওপর আঘাত।

তিনি জানান, শরিফ ওসমান হাদি বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি দৃঢ় আশ্বাস দেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তির সন্ত্রাসী অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। দেশবাসীকে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অপপ্রচার ও গুজবে কান না দিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হবে।

তিনি তরুণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, তরুণরাই নতুন বাংলাদেশের প্রধান শক্তি। নির্বাচনের আগের সময়কে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর রাখার আহ্বান জানান তিনি।

ভাষণে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁকে রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ঘোষণা করে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে—জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন।

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্বাধীন ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে এবং সংশ্লিষ্ট আসামিদের দেশে ফেরাতে সরকার ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে।

তিনি আরও জানান, জুলাই জাতীয় সনদ জারি করে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারের পথ সুগম করা হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে এই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

নির্বাচন কমিশন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভোট রক্ষা করা মানে দেশ রক্ষা করা। সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

তিনি জানান, প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি।

বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠন করা হয়েছে।

পাশাপাশি পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করে মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভাষণের শেষাংশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জনগণের হাতেই। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সবশেষে তিনি সবাইকে আবারও মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে ভাষণ শেষ করেন।