আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু: চিকিৎসক-নার্স ও কর্তৃপক্ষের অবহেলা প্রমাণিত, আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে

তদন্তে অক্সিজেনের ঘাটতি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে

স্টাফ রিপোর্টার, ৪ জুন ২০২৬, নিউজ চ্যানেল বিডি।

মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স-স্টাফ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন তুলে ধরে তিনি এ তথ্য জানান।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গত ২৭ মে ভোর থেকে সকাল ৯টার মধ্যে হাসপাতালটিতে ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং দেশের মানুষ গভীরভাবে মর্মাহত। ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল এবং নির্ধারিত সময়েই প্রতিবেদন পাওয়া গেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, হাসপাতালের ভবনটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয় বলে কমিটি মত দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ ছিল এবং সেখানে কোনো কার্যকর ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা ছিল না। এর ফলে কক্ষে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সদের মধ্যে চরম অবহেলা ও অসহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার আকস্মিক অবনতি হলেও তারা দ্রুত চিকিৎসকদের অবহিত করেননি। এমনকি প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রায় ৯০০ বর্গফুটের একটি কক্ষে ১১ নবজাতক ও তাদের স্বজনসহ প্রায় ৫০ জন অবস্থান করছিলেন, যা কক্ষটির ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। অতিরিক্ত ভিড় এবং অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ওয়ার্ডে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ছিল না। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নার্সদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লোকসমাগম নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যদিও ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা কঠিন, তবুও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পর্যালোচনায় অক্সিজেনের ঘাটতি ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি নবজাতকদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

তিনি জানান, তদন্ত কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ঘটনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, নার্স ও স্টাফদের অবহেলা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে গাফিলতি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষটি সিলগালা করা হয়েছে। তবে হাসপাতালে দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকায় পুরো হাসপাতাল তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়।

তিনি জানান, এ ঘটনায় একটি ফৌজদারি মামলা হয়েছে এবং বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন প্রক্রিয়ায় যাবে। আদালতই পরবর্তী আইনগত সিদ্ধান্ত নেবেন।

ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে ভবন পরিদর্শন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি বলেও জানান তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে। অনিয়ম বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।