গভীর সমুদ্রে গবেষণা ও সমস্যা চিহ্নিত করতে গুরুত্বারোপ প্রধান উপদেষ্টার

সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম জরিপ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় যমুনায় সভা

স্টাফ রিপোর্টার | ৮ জানুয়ারি ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি

ঢাকা, ৬ জানুয়ারি ২০২৬: গবেষণা জাহাজ R.V. Dr. Fridtjof Nansen কর্তৃক সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেমের ওপর পরিচালিত জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে এ সংক্রান্ত কমিটি।

আজ মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।

গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালিত হয়। আট দেশের ২৫ জন বিজ্ঞানী এতে অংশ নেন, যার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলাদেশের।

সভায় অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই গবেষণায় নতুন ৬৫টি জলজ প্রাণির প্রজাতির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের আধিক্য মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে, যা ইকোসিস্টেমের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ। অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।”

এছাড়া তিনি জানান, দুই হাজার মিটার গভীরতাতেও প্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

২০১৮ সালের একটি গবেষণার সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রে বড় মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং স্বল্প গভীর পানিতে আশঙ্কাজনক হারে মাছ হ্রাস পাচ্ছে।

জানা গেছে, বর্তমানে ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ফিশিং ট্রলার গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ করে থাকে। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি ট্রলার sonar ব্যবহার করে টার্গেটেড ফিশিং করছে, যা অত্যন্ত আগ্রাসী পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। এতে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা ট্রলার মালিকরা লাভবান হলেও স্বল্প গভীর পানিতে মাছ ধরা জেলেরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “এভাবে টার্গেটেড ফিশিং অব্যাহত থাকলে বঙ্গোপসাগর মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। Sonar fishing বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।”

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে টুনা মাছের আধিক্য রয়েছে এবং এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি সুন্দরবনের নিচে একটি ফিশিং নার্সারি শনাক্ত করা হয়েছে, যা সংরক্ষণের জন্য সরকার ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে।

সভায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের দেশের স্থলভাগ যতটুকু, সমপরিমাণ জলভাগও রয়েছে। কিন্তু এই সম্পদগুলো আমরা এখনো যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। এমনকি সম্পদের পরিমাণ ও সম্ভাবনা সম্পর্কেও আমাদের পর্যাপ্ত ধারণা নেই। এই সম্পদ কাজে লাগাতে হলে গবেষণা ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।”

সভায় জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির একটি বহুমুখী হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল ‘এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ’ বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই ভেসেল সমুদ্রের তলদেশ, গভীরতা ও অন্যান্য সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহে সহায়ক হবে, যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ সামুদ্রিক গবেষণা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং যাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রয়েছে, তাদের সঙ্গে গবেষণা সমন্বয় করতে হবে। এর মধ্য দিয়েই অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।”