স্টাফ রিপোর্টার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, নিউজ চ্যানেল বিডি।
ঢাকা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, কেউ চিরস্থায়ী নন, কিন্তু নতুন প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা স্থায়ী করে রাখতে হবে। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে দেশ কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে যুদ্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, সামনে আরও লড়াই আসতে পারে, তাই মহান মুক্তিযুদ্ধকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা হিসেবে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
রোববার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান, বীর উত্তম, ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হুদা, মেজর (অব.) সৈয়দ মুনিবুর রহমান, মেজর (অব.) কাইয়ুম খান, সাদেক আহমেদ খান, হাবিবুল আলম, বীর প্রতীক এবং মেজর (অব.) ফজলুর রহমান, বীর প্রতীক।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) জামিল ডি আহসান, বীর প্রতীক, মেজর (অব.) সৈয়দ মিজানুর রহমান, পিএসসি, মেজর (অব.) এ কে এম হাফিজুর রহমান এবং মনোয়ারুল ইসলাম। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীরসহ সদস্য সৈয়দ আবুল বাশার, সিরাজুল হক, মো. মনসুর আলী সরকার, অনিল বরণ রায়, নুরুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ হিল সাফী, জাহাঙ্গীর কবির ও প্রকৌশলী জাকারিয়া আহমেদ।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাকে পুঁজি করে অতীতে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন তা না ঘটে, সে জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার প্রকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, ইতিহাস লেখা এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া একটি পবিত্র দায়িত্ব। কয়েক বছর পর আর নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখতে এখন থেকেই পরিকল্পনা নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাতির ভেতরে অবিনশ্বর করে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, বিগত সরকার মুক্তিযোদ্ধার চেতনার কথা বলে বিভাজন সৃষ্টি করেছে এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চিত করেছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জঞ্জাল পরিষ্কার করে মুক্তিযোদ্ধাদের হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং গণভোটের আয়োজন করায় প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান। তাঁরা বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না এবং সরকার জনগণের কাছে আরও বেশি দায়বদ্ধ হবে।
তাঁরা আরও বলেন, গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে তা দেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে। ব্যক্তিগত পরিসরে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কথাও জানান তাঁরা।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশ এখন নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের যে সুযোগ এসেছে, তা কাজে লাগাতে গণভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কার ও পরিবর্তন না হলে দেশ বারবার একই জায়গায় ঘুরপাক খাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীর বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, অপ-রাজনীতির কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘদিন ধরে একঘরে করে রাখা হয়েছে।
বৈঠকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, গত ১৬ বছরে তাঁদের সম্মান এতটাই ক্ষুণ্ন হয়েছে যে অনেক সময় পরিচয় দিতেও সংকোচ বোধ করতেন। ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হুদা বলেন, দীর্ঘদিন পর বাকস্বাধীনতা ফিরে এসেছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে বর্তমান সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, একাত্তরের মতোই চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তরুণরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছে। একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা প্রতিহত করার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকের শেষে তিন সংগঠনের নেতারা তাঁদের চলমান কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ, স্মৃতিসৌধ রক্ষা, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট বাতিল এবং কল্যাণ ট্রাস্টের সম্পদের সঠিক ব্যবহারে কাজ চলছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং সম্পদ দেশের স্থায়ী মঙ্গলের জন্য ব্যবহার করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারে থাকুন বা না থাকুন, নাগরিক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করে যাবেন।





