জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগবান্ধব নীতি: জ্বালানি মন্ত্রী

সৌরবিদ্যুতে ১০ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য অর্জনে আগ্রাসী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে

স্টাফ রিপোর্টার | ১১ আগস্ট ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি

ঢাকা: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। দেশের শিল্প ও অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের জন্য অর্থ উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

মঙ্গলবার ঢাকা ক্লাবে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতে সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, এলএনজি অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কোনো একটি স্থাপনায় দুর্ঘটনা ঘটলে যাতে এর নেতিবাচক প্রভাব সারাদেশের শিল্প-কারখানায় না পড়ে, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা ও সময় নির্ধারণ নিয়েও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

তিনি বলেন, শিল্প-কারখানাগুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তা, বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা হচ্ছে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। জ্বালানি খাতের সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক প্রয়োজন।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে সতর্কতার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, উন্নত দেশগুলোতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে রিজার্ভেশন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়নও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাই বাংলাদেশকেও সতর্কতার সঙ্গে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে এগোতে হবে।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকার আগ্রাসী পরিকল্পনা নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাত্র দুই মাসের মধ্যে নতুন একটি নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব করতে এতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ বছরের কর অবকাশও রয়েছে।

তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগকারীদের হয়রানি বন্ধে নীতিমালায় উল্লেখিত সুবিধাগুলো বাস্তবায়ন করবে সরকার। ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করা সম্ভব বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মন্ত্রী জানান, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ করে ওপেক্স মডেলকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা শহর থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের পরিবর্তে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশনের দুই প্রশাসনের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। এলাকাভিত্তিক জায়গা নির্ধারণ করে বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকে বিনিয়োগের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কেবল টেলিভিশন বা ওয়াই-ফাই ব্যবসার মতো বিনিয়োগকারীরা রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল আদায় করতে পারবেন। ফলে সবকিছুর জন্য সরকারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন হবে না।

বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে সরকারি জমি ব্যবহারের বিষয়ে অংশীদারিত্বমূলক মডেলের কথাও জানান তিনি। সরকার প্রকল্পের জন্য জমি দিতে পারে এবং বিনিয়োগ কাঠামোর মধ্যে ওই জমির মূল্যকে সরকারের শেয়ার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে বলে জানান মন্ত্রী।

জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে আরও সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে কেন্দ্র করে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অযথা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও আতঙ্কে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। পরে কালোবাজারি ও অনলাইনভিত্তিক জ্বালানি বিক্রির ঘটনাও দেখা যায়।

এ পরিস্থিতির পর বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।

জ্বালানি আমদানির নীতিমালা কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ নাকচ করে মন্ত্রী বলেন, সাধারণ আইন বা নীতিমালা হলে তা কোনো একটি কোম্পানির জন্য হবে না; সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।

জ্বালানি খাত নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সংকট বাড়ানোর চেষ্টা না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে দেওয়া বিনিয়োগ প্রস্তাব আকর্ষণীয় ও শিল্পের জন্য সহায়ক হলে দ্রুত অনুমোদনের আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রস্তাব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ও যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন।