সংস্কারে যা অর্জিত হয়েছে তা তুচ্ছ করে দেখা ঠিক নয়: আসিফ নজরুল

পুলিশ সংস্কার কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে অতিরিক্ত নেতিবাচক সমালোচনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

স্টাফ রিপোর্টার | ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি

সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনার জবাবে আসিফ নজরুল বলেছেন, যা অর্জিত হয়েছে সেটিকে তুচ্ছ বা অর্থহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া সঠিক নয়। বিশেষ করে পুলিশ সংস্কার কমিশনের আইন নিয়ে নিজের হতাশার কথা স্বীকার করলেও তিনি বলেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী সবকিছু করা সম্ভব না হলেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমার প্রত্যাশা যদি ১০ হয়, অন্তত ৪ অর্জিত হয়েছে। আগে যেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে কোনো মতামত রাখার সুযোগই ছিল না, সেখানে এখন একটি নিরপেক্ষ ফোরাম থেকে মতামত দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে—এটাকে তুচ্ছ বলা যায় না।”

সংস্কার কমিশনে কনসালটেশন হয়নি—এমন অভিযোগকে হাস্যকর আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময়ও এত বিস্তৃত পরামর্শ প্রক্রিয়া হয়নি, যতটা হয়েছে বর্তমান সংস্কার কমিশনগুলোতে।

তিনি আরও বলেন, “অনেকে বলেন তাদের কোনো সুপারিশই রাখা হয়নি। এটা সত্য নয়। আপনি যদি ১০টি সুপারিশ করেন, তার মধ্যে অন্তত ৬টি রাখা হয়েছে—এই সত্যটা স্বীকার করা উচিত।” সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার কারণে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এ কথা বলতে পারেন বলে জানান।

নেতিবাচক প্রচার প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, কিছু মানুষের কাছে নেগেটিভিটি হয়তো এক ধরনের উদ্দীপক, আলোচনায় থাকার কৌশল। কিন্তু এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং হতাশ হয়। মানুষের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করাও রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব।

বিচার বিভাগ সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে—নিম্ন আদালতের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা এবং বেঞ্চ গঠনসহ সবকিছু এখন উচ্চ আদালতের নিয়ন্ত্রণে। এটি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেছে ঠিকই, তবে জবাবদিহিতা ছাড়া অসীম স্বাধীনতা সবসময় প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনে না।

এই প্রেক্ষাপটে উচ্চ আদালতের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে আসিফ নজরুল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা বলেন। প্রথমত, প্রধান বিচারপতির ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ কমিয়ে বেঞ্চ গঠনে আরও গণতান্ত্রিক ও সমষ্টিগত সিদ্ধান্তের ব্যবস্থা করা।

দ্বিতীয়ত, উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য যুগোপযোগী ও কঠোরভাবে প্রয়োগযোগ্য কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। তিনি বলেন, অতীতে কিছু বিচারকের আচরণ জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার এলে এমন পরিস্থিতি পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

তৃতীয়ত, কনটেম্পট অব কোর্ট আইনের সংস্কার। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে অনেক কিছু বলার সাহস থাকলেও উচ্চ আদালতের বিচারকদের সমালোচনা করতে সবাই ভয় পেত, কারণ সঙ্গে সঙ্গে কনটেম্পট মামলা দেওয়া হতো। যেখানে অভিযোগকারী ও বিচারক একই ব্যক্তি হন, সেখানে ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত পূরণ হয় না।

বক্তব্যের শেষাংশে আসিফ নজরুল বলেন, এসব ক্ষেত্রে সংস্কার হলে উচ্চ আদালত আরও কার্যকর ও কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারবে এবং প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।