হ্যাঁ ভোটের প্রচারণায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বাধা নেই: আলী রীয়াজ

গণভোট রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডা, কোনো দলকে ক্ষমতায় বসানো বা ঠেকানো নয়—বলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী

স্টাফ রিপোর্টার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, নিউজ চ্যানেল বিডি।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সামনে কোনো আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, এবারের গণভোট কোনো দলকে ক্ষমতায় বসানো কিংবা কোনো দলকে ক্ষমতায় যেতে বাধা দেওয়ার এজেন্ডা নয়; এটি রক্তের অক্ষরে লেখা জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডা—যা বাংলাদেশের সকল মানুষের।

গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে বিভাগীয় কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসনের আয়োজনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ঢাকা বিভাগের কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার, বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।

সভায় প্রফেসর আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে ‘একবাক্যে’ মত পাওয়া গেছে—গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ওপর কোনো আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই। যারা এ বিষয়ে বাধা আছে বলে প্রচার করছে, তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে অথবা ভিন্ন উদ্দেশ্যে বিষয়টি উত্থাপন করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যে ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল, তার বিরুদ্ধে যারা সংগ্রাম করেছেন এবং জেল–জুলুম–নিপীড়ন সহ্য করেছেন—তারাই আমাদের দুইটি দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। প্রথম দায়িত্ব হলো ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র যেন আর ফিরে আসতে না পারে সেই পথ রুদ্ধ করা। আরেকটি দায়িত্ব হচ্ছে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের পথনকশা নির্মাণ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ ২৭ থেকে ৩৭ বছরের নিচে—আগামী অন্তত ৪০ বছর এই দেশ কেমনভাবে চলবে, আজ সেই পথ নির্ধারণ করা আমাদের দায়িত্ব।

আলী রীয়াজ বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কেবল কর্মকর্তা-কর্মচারী নন, তারা একই সঙ্গে নাগরিকও। তাই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে নাগরিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্নে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্তদের জনগণের সেবায় সর্বদা সচেষ্ট থাকার কর্তব্য এবং নাগরিকদের আইন মানা, শৃঙ্খলা রক্ষা ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে। সেই দায়িত্বের আলোকে গণভোটে মানুষকে সচেতন করা ও ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করার কাজও নাগরিক কর্তব্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তির বিষয়টি উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, দীর্ঘ সময় ভোট নিয়ে অনাস্থার কারণে অনেকের কাছে গণভোট নতুন অভিজ্ঞতা। ফলে জনগণকে বোঝাতে হবে কীভাবে ব্যালটে ভোট দিতে হবে এবং ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের অর্থ কী। তারা জানান, গণভোটের ব্যালটে ‘টিক চিহ্ন’কে প্রচারণার মূল প্রতীক হিসেবে ধরে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে আনতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

আলী রীয়াজ আরও বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তিনটি ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করছে—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। তিনি বলেন, নির্বাচন সরকার আয়োজন করে না; সরকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, আর নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। একইভাবে বিচারও আদালত পরিচালনা করবে; সরকার শুধু বিচার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করছে।

অতীতে এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সংবিধান সংশোধন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়নের সময় জাতীয় সংসদের কমিটিতে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের সদস্য ছিল না। কমিটি ২৫-২৬টি বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার সিদ্ধান্ত দিলেও পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি বৈঠকের পর সেটি পরিবর্তন হয়। তিনি বলেন, এক ব্যক্তির ইচ্ছায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে এবং সংবিধান সংশোধনী যেন “ছেলেখেলায়” পরিণত না হয়, সে জন্যই পরিবর্তন জরুরি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৪৮টি সুপারিশ গণভোটে আসছে চারটি ক্যাটাগরিতে। তবে কার্যত প্রশ্ন একটি—আপনি কি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে, না বিপক্ষে।

মনির হায়দার বলেন, গণভোট ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে এবং তা আরও বীভৎস ও নৃশংস রূপ নিতে পারে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু গত ৫৪ বছরে সেই রাষ্ট্র অর্জিত হয়নি। তাঁর মতে, জুলাই অভ্যুত্থান সেই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ তৈরি করেছে এবং গণভোটের মাধ্যমে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

সভায় ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।