জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বগুড়া: শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের ভাবনা, সমস্যা ও প্রস্তাব সরাসরি শুনতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি। বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলার নির্বাচিত ১৬১ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তাঁদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন তিনি। শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য নিজ হাতে নোটও করেন প্রতিমন্ত্রী।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে দুই উপজেলার শিক্ষকদের পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তাঁদের মধ্য থেকে ১৬১ জনকে নির্বাচিত করা হয়। জাইমা রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে নির্বাচিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তাঁর ছবি সংবলিত মগ উপহার দেন প্রতিমন্ত্রী।
সভায় শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সরকারের ভূমিকা, শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মীর শাহে আলম বলেন, সব পেশার মানুষকে গড়ে তোলেন শিক্ষকরা। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষকসমাজ অবহেলিত। দীর্ঘদিন দেশপ্রেমিক সরকার ক্ষমতায় না থাকায় শিক্ষকদের এই অবহেলা আরও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী।
স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে বক্তব্য
স্বাধীনতার ইতিহাস তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার আগে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তাজউদ্দীন আহমদসহ অনেকে অনুরোধ করলেও তিনি ঘোষণা দিতে রাজি হননি বলে মন্তব্য করেন মীর শাহে আলম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
তিনি আরও দাবি করেন, ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ সরকার জিয়াউর রহমানের ঘোষণাকে স্বীকৃতি দিয়ে ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করে। এ সময় ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করাকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ
জিয়াউর রহমানের শাসনামলের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান দেশকে স্বনির্ভর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশকে পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়। পরে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চাঙা করার চেষ্টা করেন।
ওয়ান-ইলেভেনের সরকার দেশের রাজনীতিতে স্বৈরাচারের ধারার সূচনা করে এবং পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সরকার ফ্যাসিবাদী আচরণ শুরু করে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘ সংকট থেকে দেশকে উত্তরণের দায়িত্ব এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর বর্তেছে।
রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীতের দাবি
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম দাবি করেন, স্বৈরাচারী শাসনামলে রিজার্ভ ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময়ে তা বেড়ে ২৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। বিএনপি সরকার সাত মাসে রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছেন বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তবে দেশের চলমান সংকটের জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি সংকট নিয়ে অভিযোগ
জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী অভিযোগ করেন, তেল-গ্যাসের সংকটকে বড় করে দেখানোর জন্য আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের একটি অংশ যোগসাজশ করে পরিকল্পিতভাবে পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য দেখিয়ে সংবাদ প্রচার করিয়েছে।
তাঁর দাবি, তেলের দাম কিছুটা বাড়ার পর মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ ঘটনাকে পরিকল্পিত চক্রান্তের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তিন ঐতিহাসিক অর্জনের ট্রফিই বিএনপির ঘরে
বিএনপির রাজনৈতিক অর্জন তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, দেশের স্বাধীনতা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে বিএনপির ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭১ সালে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে নিজেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের অবদান রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। জুলাইয়ের আন্দোলনেও বিএনপি ও জামায়াতের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের আমির তারেক রহমানকে জুলাই আন্দোলনের মূল ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে দাবি করে মীর শাহে আলম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই অভ্যুত্থান, দেশের এই তিন ঐতিহাসিক অর্জনের ট্রফিই বিএনপির ঘরে রয়েছে। তাই তিনটি ট্রফি জয় করা দলকে পতনের হুমকি দিয়ে লাভ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক আন্দোলনে শিক্ষকদের ভূমিকার আহ্বান
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শিক্ষকদের সামাজিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, শিক্ষকদের শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সমাজের অনিয়ম, অসংগতি ও অপরিচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।
পরিচ্ছন্ন সমাজ গঠন, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং শিক্ষার্থীদের মানবিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান মীর শাহে আলম।





