ওসমান হাদী হত্যা: সিআইডির তদন্তে কী কী নতুন তথ্য এলো?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য ঘিরে নতুন আলোচনা, তদন্তে ২৩ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য

স্টাফ রিপোর্টার, ৩ জুন ২০২৬, নিউজ চ্যানেল বিডি।

শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলাটি আবারও আলোচনায় এসেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। এদিকে মামলার অধিকতর তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি গত পাঁচ মাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটন করেছে। নিচে বিষয়ভিত্তিকভাবে তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরা হলো।


মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে নতুন বিতর্ক

পশ্চিমবঙ্গের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এমন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে যার নাম এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

তার এই বক্তব্যের পর বাংলাদেশে নতুন করে মামলাটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে সিআইডি বলছে, তাদের তদন্তে এখন পর্যন্ত বিদেশি কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


ডিবি থেকে সিআইডির হাতে তদন্ত

গত ৬ জানুয়ারি ডিবি পুলিশ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।

পরে বাদীপক্ষের আপত্তির প্রেক্ষিতে ১৫ জানুয়ারি মামলাটির অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে। তদন্ত শুরু করার পর থেকেই নতুন তথ্য সংগ্রহে কাজ শুরু করে সংস্থাটি।


রুবেল গ্রেপ্তার ও জবানবন্দির গুরুত্ব

তদন্তের শুরুতেই ছাত্রলীগ কর্মী মোহাম্মদ রুবেলকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

রুবেল আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে দাবি করেন, আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের পিএস মাসুদুর রহমান বিপ্লব এবং আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রুবেল হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই দুই ব্যক্তি ফয়সাল করিম মাসুদকে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচন করেন এবং পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন।


মোটরসাইকেলের সূত্রে নতুন তথ্য

হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ফয়সালের বোনের বাসার গ্যারেজ থেকে উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া ভুয়া নম্বর প্লেট একটি ম্যানহোলের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, মোটরসাইকেলটির মালিক মাইনুদ্দিন শুভ।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, শুভ মোটরসাইকেলটি আলমগীরের কাছে দেন এবং আলমগীর সেটি ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। ঘটনার পর থেকে শুভ পলাতক রয়েছেন।


অস্ত্র উদ্ধারে সিআইডির সাফল্য

তদন্তের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার।

সিআইডি নরসিংদীর একটি খাল থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার করে। ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, এই অস্ত্র দিয়েই ওসমান হাদীকে গুলি করা হয়েছিল।

অস্ত্রটির সিরিয়াল নম্বর বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা অস্ত্র সরবরাহ চক্রের সন্ধান পান।


অস্ত্র সরবরাহকারী কে?

তদন্তের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম থেকে অস্ত্র ব্যবসায়ী মাজিদুল হক হেলালকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি যুবলীগের সাবেক নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার কাছে সরবরাহ করা হয়েছিল।

তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।


নতুন ছয়জনের নাম সামনে এসেছে

ডিবির অভিযোগপত্রে ১৭ জনের নাম থাকলেও সিআইডির তদন্তে আরও ছয়জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

ফলে বর্তমানে মোট ২৩ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য তদন্তকারীদের হাতে রয়েছে। তবে নতুন কয়েকজনের ভূমিকা এখনো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।


কারা জড়িত বলে ধারণা করছে সিআইডি?

সিআইডির দাবি, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

কেউ কেউ দেশে অবস্থান করে এবং কেউ বিদেশে থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।


মাস্টারমাইন্ড হিসেবে বাপ্পির নাম

তদন্তে পল্লবীর সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা বাপ্পির নাম হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উঠে এসেছে।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।


ফয়সালকে ফেরানো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

তদন্তকারীদের মতে, মামলার তদন্ত অনেকটাই শেষ পর্যায়ে।

তবে প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদকে ভারতে থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে মামলার বাকি অমীমাংসিত বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে।

তার কাছ থেকে নতুন তথ্য পাওয়ার আশা করছেন তদন্তকারীরা।


সরকারের পদক্ষেপ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফয়সালকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।

সিআইডি প্রয়োজনীয় নথিপত্র পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দিয়েছে। সেগুলো স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এখন ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক সাড়ার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।


ওসমান হাদী হত্যা মামলার তদন্তে গত পাঁচ মাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করছে সিআইডি। অস্ত্র উদ্ধার, মোটরসাইকেলের মালিক শনাক্তকরণ, নতুন সন্দেহভাজনের নাম এবং একাধিক জবানবন্দি তদন্তকে নতুন দিকে নিয়ে গেছে। এখন প্রধান অভিযুক্ত ফয়সালকে দেশে ফিরিয়ে আনাই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


তথ্যসূত্র ও সৌজন্যে: সময় সংবাদ
প্রতিবেদন: মাসুদুর রহমান, সিনিয়র রিপোর্টার, সময় সংবাদ