জ্বালানি সংকট নয়, অতিরিক্ত মজুদই চ্যালেঞ্জ:বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী

সরবরাহ স্বাভাবিক, আতঙ্কে অতিরিক্ত ক্রয়ে বাজারে চাপ—সংসদে বক্তব্য

স্টাফ রিপোর্টার | ৩০ মার্চ ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি

জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি সংকট নয়, বরং অতিরিক্ত মজুদ প্রবণতাই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

তিনি সংসদে ৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতিতে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহ অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আগাম প্রস্তুতি, ধারাবাহিক আমদানি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই; বরং গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশে ডিজেলের মজুদ ছিল প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন, যা ৩০ মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টনে। ৪১ দিনে প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হলেও মজুদ বৃদ্ধি সরকারের কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।

আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সরকার জ্বালানি সরবরাহ আরও বাড়িয়েছে, যাতে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্ন থাকে। ২০২৬ সালের মার্চে ২০২৫ সালের তুলনায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

তবে তিনি বলেন, বাস্তব চাহিদা সেই হারে না বাড়লেও জনমনে অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি মোটরসাইকেল যেখানে সাধারণত ৫ লিটার অকটেন নেয়, সেখানে অনেকেই দিনে একাধিকবার এসে ১৫-২০ লিটার পর্যন্ত সংগ্রহ করছেন।

মন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের মার্চে একটি ফিলিং স্টেশনে দৈনিক গড়ে ৫,৪০০ লিটার অকটেন বিক্রি হলেও ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে প্রায় ১০,৬২০ লিটারে পৌঁছেছে—যা প্রায় ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি।

তিনি বলেন, দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৬৩ শতাংশই ডিজেল, আর অকটেন ও পেট্রোলের অংশ যথাক্রমে ৬-৭ শতাংশ। ফলে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের চিত্র প্রকৃত সংকট নয়, বরং অতিরিক্ত মজুদের প্রতিফলন।

অবৈধ মজুদ ও পাচার রোধে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ৫৩টি মামলা দায়ের, প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২ লাখ ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে।

সরকার এপ্রিল মাসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে এবং দেশীয় উৎস থেকে আরও ৩০ হাজার মেট্রিক টন সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দুই মাসের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে।

মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। বর্তমানে ডিজেলের প্রকৃত ব্যয় প্রতি লিটার প্রায় ১৯৮ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। অকটেনের ক্ষেত্রেও ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ক্রয় ও মজুদ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং অপচয় রোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, “সংকটের সময় রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব জনগণের পাশে দাঁড়ানো। তবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় জনগণের সহযোগিতাও অত্যন্ত জরুরি।”

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেকোনো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।