ডিজিটাল ভূমি সেবায় কমছে হয়রানি, বাড়ছে স্বচ্ছতা

অনলাইনে খাজনা, নামজারি ও খতিয়ান যাচাইয়ে স্বস্তিতে নাগরিকরা

স্টাফ রিপোর্টার, ১২ মে ২০২৬, নিউজ চ্যানেল বিডি।

ভূমি অফিসে যাওয়ার প্রয়োজনের কথা মনে পড়লেই একসময় গায়ে জ্বর এসে যাওয়ার জো হতো। লম্বা লাইন, দালালের দৌড়াত্ম্য, এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ফাইল নড়তে টাকা গোনার ঝক্কি- আরও কত কী। তবে সময় বদলেছে। এখন কেউ চাইলেই নিজের কাজ নিজে করতে পারছেন। জমির উন্নয়ন কর দেওয়া, নামজারিসহ অন্যান্য সেবা খুব সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। ঘরে বসেই মিলছে প্রয়োজনীয় সেবা।

ভবিষ্যতে জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম) প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে -এর। এতে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ কমবে এবং মামলা-মোকদ্দমাও হ্রাস পাবে।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে জাল কাগজপত্র শনাক্তকরণ, একই জমি একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা প্রতিরোধ এবং আবেদন দ্রুত যাচাইয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে বর্তমানে মুঠোফোনেই পাওয়া যাচ্ছে ভূমি সংক্রান্ত তথ্য। জমির খারিজ করা আছে কিনা তা ঘরে বসেই জানা যাচ্ছে। কর কত বাকি সেটিও জানা যাচ্ছে। ফলে দালালের দৌড়াত্ম্য ও দুর্নীতি কমছে, বাড়ছে স্বচ্ছতা; নাগরিক জীবনে ফিরে এসেছে স্বস্তি।

ঘরে বসেই খাজনা পরিশোধ

বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই কর পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ই-পর্চা ও ই-খাজনা কার্যক্রম চালুর পর প্রতিবছরই অনলাইনে কর পরিশোধকারীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ নাগরিক অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করছেন।

এসব করদাতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিও রয়েছেন। তারা বিদেশে বসেই নিজেদের জমির খাজনা পরিশোধ করছেন। ফলে ভূমি অফিসে সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে।

অনলাইনে নামজারিতে কমছে দালাল নির্ভরতা

জমি কেনাবেচার পর মালিকানার প্রমাণপত্র পুনর্নির্ধারণ করতে যেতে হয় নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়ায়। এটি আগে ছিল সবচেয়ে জটিল ধাপগুলোর একটি। আবেদন করতে গিয়ে অনেকেই দালালের শরণাপন্ন হতেন এবং বাধ্য হয়ে সরকারি ফি’র চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা খরচ করতেন।

বর্তমানে অনলাইনে নামজারি আবেদন চালুর ফলে সেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আবেদনকারী নিজেই অনলাইনে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড এবং আবেদনের অগ্রগতি মোবাইল ফোনে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। প্রতিটি ধাপে এসএমএস নোটিফিকেশন চালু থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটিরও বেশি ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখের বেশি আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পেন্ডিং আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মাঠ প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ এখন হাতের নাগালে

ভূমি সংক্রান্ত প্রতারণা রোধে খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে এই তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময় ভুয়া কাগজপত্রের কারণে মানুষ প্রতারিত হতো। এখন অনলাইনে জমির মালিকানা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির পরিমাণ যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।

দালালচক্রের দৌরাত্ম্য হ্রাস

একসময় ভূমি অফিসকেন্দ্রিক দালালচক্র সাধারণ মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করত। তথ্যের অভাব ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে তাদের সহায়তা নিতেন।

বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক সেবা চালুর ফলে সেই নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে। নির্ধারিত ফি ও সময়সীমা অনলাইনে উন্মুক্ত থাকায় অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা অযৌক্তিক বিলম্বের সুযোগ কমে গেছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কারণে কোন কর্মকর্তা কতদিন ধরে একটি আবেদন আটকে রেখেছেন, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে জবাবদিহিতা বেড়েছে।

ডিজিটাল ডাটাবেজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের সব ভূমি রেকর্ড, খতিয়ান এবং মৌজা ম্যাপ একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার পুরোনো রেকর্ড স্ক্যান করে ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালু হলে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ কমবে এবং মামলা-মোকদ্দমাও হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে জাল কাগজপত্র শনাক্তকরণ, একই জমি একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা প্রতিরোধ এবং আবেদন দ্রুত যাচাইয়ের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।