
জুলাই সনদ: ঐকমত্যের সংকট ও সম্ভাবনার বিশ্লেষণ
তিন দলের আপত্তি, বিএনপি মোটামুটি একমত—এখানে কি জাতীয় ঐক্য সম্ভব?
লেখক: মো: মিজানুর রহমান সাংবাদিক
রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’ সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক উদ্যোগ। সরকারি উদ্যোগে তৈরি করা এই খসড়া সনদে সংসদীয় কাঠামো, নির্বাচনী ব্যবস্থা, এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। তবে খসড়াটি সামনে আসার পরই দেশের অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছে। অপরদিকে, দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বিএনপি খসড়ার বেশিরভাগ বিষয়ের সঙ্গে ‘মোটামুটি একমত’ হলেও চূড়ান্ত অবস্থান নেয়নি।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—এই সনদটি আদৌ জাতীয় ঐকমত্য অর্জন করতে পারবে কি?
আপত্তির কেন্দ্রে কী রয়েছে?
জাতীয় নাগরিক পার্টি,(এনসিপি), গণসংহতি আন্দোলন, এবং বাংলাদেশ গণঅধিকার পরিষদ—এই তিনটি দল যে আপত্তি তুলেছে, তা কেবল রাজনৈতিক নয়, কাঠামোগতও। বিশেষ করে সংসদের উচ্চ কক্ষ গঠনের পদ্ধতি, ভোটের অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব, এবং ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ—এই ইস্যুগুলো তাদের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জামালপুরে এক বক্তব্যে বলেন:
“উচ্চ কক্ষ পিআর ভিত্তিতে (ভোটের অনুপাতে) না হলে এ সনদ অর্থহীন হয়ে পড়বে।”
তার বক্তব্যে স্পষ্ট, উচ্চ কক্ষকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক স্তর হিসেবে গঠনের চিন্তা নয়—তাকে গণতন্ত্রের ভারসাম্যের স্তম্ভ হিসেবে দেখতে হবে।
গণসংহতি আন্দোলনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে,
“এটি যেন কেবল সরকার পরিবর্তনের রূপরেখা না হয়, বরং এটি হতে হবে একটি নতুন রাজনৈতিক চুক্তি।”
বাংলাদেশ গণঅধিকার পরিষদ চাইছে স্থানীয় সরকার ও নাগরিক ক্ষমতায়নের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি।
বিএনপি: নীরব সমর্থন না কৌশল?
বিএনপির প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সংযত। দলটির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন,
“বেশিরভাগ বিষয়ে আমরা একমত, কিন্তু কিছু টেকনিক্যাল জায়গায় এখনও আলোচনা প্রয়োজন।”
এই অবস্থান রাজনৈতিকভাবে কৌশলী। বিএনপি হয়তো এখনই সনদের পাশে পুরোপুরি দাঁড়াচ্ছে না, আবার প্রত্যাখ্যানও করছে না। তাদের এই অবস্থান দুই দিক খোলা রাখার কৌশল হিসেবেই দেখা যেতে পারে—বিশেষত যদি সনদের চূড়ান্ত রূপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়।
জুলাই সনদ: কেবল প্রতীকী, না বাস্তব সংস্কারের পথ?
প্রশ্ন উঠছে—এই সনদ কেবল রাজনৈতিক প্রতীক হতে চলেছে, না কি এটি ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করবে?
খসড়ায় থাকা কিছু বিষয় ইতিবাচক—যেমন:
- সংসদের দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট কাঠামোর ভাবনা
- নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নির্ধারণ
- অনির্বাচিত নিয়ন্ত্রণমূলক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার
- রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শর্ত সহজীকরণ
তবে এগুলোর অধিকাংশই “ইচ্ছা প্রকাশ” বা “নীতিগত লক্ষ্য” হিসেবে রাখা হয়েছে। কোনটা বাধ্যতামূলক, কোনটা সময়সীমার মধ্যে হবে—এই বিষয়গুলো অনির্দিষ্ট। এখানেই বিরোধী দলেরা সন্দিহান।
ঐকমত্য না হলে কী হবে?
যদি এই সনদের চারপাশে স্পষ্ট জাতীয় ঐক্যমত্য তৈরি না হয়, তাহলে এটি রাজনৈতিক দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। সেক্ষেত্রে এটি হতে পারে আরেকটি ‘আলোচনার বিষয়’, কিন্তু গণতান্ত্রিক সংস্কারের রূপরেখা নয়।
নাহিদ ইসলামের মন্তব্য তাই সতর্ক বার্তার মতো শোনায়:
“ঐকমত্য না হলে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।”
‘জুলাই সনদ’ যদি সত্যিকারের রাজনৈতিক সংস্কারের দলিল হতে চায়, তবে কেবল একতরফা প্রস্তাবনা নয়, বহুপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তি হওয়া জরুরি। এটিকে সর্বদলীয় বৈঠকের মাধ্যমে সংশোধন ও চূড়ান্ত করতে হবে—যেখানে প্রতিটি দলের আপত্তি যুক্তিসহ বিবেচনায় নেওয়া হবে।
না হলে এই সনদও হয়ে উঠবে অতীতের বহু অকার্যকর উদ্যোগের মতো—উজ্জ্বল কাগজে লিখিত, কিন্তু বাস্তবে নিষ্প্রভ।





