স্টাফ রিপোর্টার | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে স্বাক্ষর হয়েছে, সেগুলোর সবই বাস্তবায়ন করা হবে। প্রয়োজন হলে সংবিধান সংশোধন করেই এসব বিষয় বাস্তবায়ন করা হবে।
শুক্রবার সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ হুইপ বলেন, ‘জুলাই সনদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার। আমরা দাড়ি, কমা, সেমিকোলনসহ যা কিছু স্বাক্ষর হয়েছে, তার সবটাই বাস্তবায়ন করব। বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।’
বিরোধী দলের সঙ্গে একযোগে কাজের আশ্বাস
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে চায় বলে জানান নূরুল ইসলাম মনি। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সংবিধান প্রণয়নের পর বিভিন্ন সময়ে এটি সংশোধনের নজির রয়েছে উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব এবং সরকারও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সে পথেই এগোতে চায়।
তৃতীয় অধিবেশনে ছয়টি বিল পাস
চিফ হুইপ জানান, জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন নয়টি কর্মদিবস চলেছে। ২৭ আগস্ট শুরু হয়ে ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া এই অধিবেশনে ছয়টি বিল উত্থাপিত ও ছয়টি বিল পাস হয়েছে।
তিনি জানান, সংসদের কার্যপ্রণালির বিভিন্ন বিধিতে নোটিশ ও আলোচনা হয়েছে। বিধি ৬৮-এ দুটি নোটিশ, বিধি ৭১-এ ১৪টি বিষয় এবং দুই মিনিটের বক্তব্যের বিধিতে ১২৪টি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার জন্য ১৪৪টি প্রশ্নের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টির উত্তর দিয়েছেন। মন্ত্রিসভার সদস্যরা মোট ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৬৭৮টির উত্তর দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
বাবা-মায়ের সুরক্ষায় নতুন আইন
তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলোর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর ও সম্পত্তিতে আজীবন ভোগদখলের অধিকার-সংক্রান্ত আইন অন্যতম বলে জানান চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা সন্তানদের সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পর বৃদ্ধ বয়সে অসহায় হয়ে পড়েন এবং কেউ কেউ বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করতে বাধ্য হন। নতুন আইনের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট সমাধানে সময় প্রয়োজন
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, আন্দোলন বা লংমার্চ করে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে কমপক্ষে দুই থেকে তিন বছর সময় প্রয়োজন।
আগের সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন চুক্তি ও ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে না থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার এসব বিষয় পর্যালোচনা করছে।
পাঁচ মাসে ২০৫ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত পাঁচ মাসে আগের সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ২০৫ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে।
সরকারি অর্থ ব্যয়ে অপচয় রোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত সার মজুদের দাবি
কৃষকদের সহায়তায় কৃষিঋণ ও কৃষক কার্ডের বিষয়টি সরকারের প্রথম দিকের সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে বলে জানান চিফ হুইপ।
দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, বর্তমানে ১৬ লাখ মেট্রিক টন সার অতিরিক্ত রয়েছে। সার ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটি থাকতে পারে, তবে কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে।
১০১টি সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা
বিদেশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ১০১টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে সরকার আলোচনা ও পর্যালোচনা করছে বলে জানান চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, এসব বিষয়ে দ্রুত ফল পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে চুক্তিগুলোর আর্থিক দিকও বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো দেশকে শত্রু হিসেবে না দেখে সবাইকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করা হলেও জাতীয় স্বার্থই অগ্রাধিকার পাবে।
বিরোধী দলকে স্থায়ী কমিটিতে গুরুত্ব
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব প্রসঙ্গে চিফ হুইপ জানান, ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২২টিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। অন্য কমিটিগুলোতে দুজন করে বিরোধী দলের সদস্য রয়েছেন।
সরকারি অর্থ ব্যয়ের ওপর নজরদারি করা পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সভাপতি পদটি বিরোধী দলের সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের আহ্বান
চিফ হুইপ সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারের ভুল হলে সেটিও লিখতে হবে এবং সরকার সঠিক কাজ করলে সেটিও তুলে ধরতে হবে।
তিনি বলেন, সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি থাকলে সাংবাদিকরা তা তুলে ধরবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করছেন বলেও দাবি করেন।
চিফ হুইপ বলেন, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ইচ্ছা করলে আইন পাস করতে পারে। তবে সরকার তা না করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চায়। প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, তিনি কোনো একটি দলের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
দেশকে স্বাবলম্বী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিরোধী দলসহ সবার সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।





