পুরনো সমস্যায় আটকে বিদেশি বিনিয়োগ, নতুন বিনিয়োগে গতি নেই

কাস্টমস, আদালত ও লাইসেন্সিং জটিলতায় দুর্বল সমন্বয়; রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকটে

স্টাফ রিপোর্টার | ৮ জানুয়ারি ২০২৬ | নিউজ চ্যানেল বিডি

পুরনো কাঠামোগত সমস্যায় আটকে রয়েছে বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগ। কাস্টমস আদালত, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা তদারকিতে দুর্বল সমন্বয়ের অভাব এখনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি দপ্তরগুলোর কাজেও একই ধরনের সমন্বয়হীনতার চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে।

বিডার নির্বাহী সদস্যরা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে পরিচালন দক্ষতার ক্ষেত্রে ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ—এমন ইতিবাচক দিকও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিদেশি বিনিয়োগে জটিলতার সূচনা হয় গত পাঁচ বছরে একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে। কোভিড-১৯ মহামারি, ডলার বাজারের অস্থিরতা এবং রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ দেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়। এর প্রভাবে মানুষের প্রকৃত আয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে এবং দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে।

এই সংকটের বোঝা উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর এসে পড়ে। যদিও আগের তুলনায় মুদ্রাবাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে এবং অর্থপাচার কমেছে, তবুও বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি আসেনি।

তবে পুরোপুরি হতাশ নয় বিডা। সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ মিলিয়ে মোট ১৬১টি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।

বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের শীর্ষে রয়েছে পোশাক, বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং খাত। তবে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে রাসায়নিক শিল্পে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহে এগিয়ে রয়েছে নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য ও চীন।

পুরনো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার একটি ইতিবাচক চিত্র পাওয়া গেলেও নতুন করে বিনিয়োগ আসার ক্ষেত্রে এখনো বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।

বিডার কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরের শুরুতে আগস্ট–সেপ্টেম্বর সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও পুরো বছরে বিনিয়োগে একটি ইতিবাচক মোমেন্টাম বজায় ছিল। তবে বৈশ্বিকভাবে এফডিআই ও ইকুইটি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়েছে।

বিনিয়োগ বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী নেতারা বিনিয়োগে মন্দার মূল কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, মার্কিন শুল্কনীতি বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগ পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

পাশাপাশি অবকাঠামো ঘাটতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা। ব্যবসায়ীদের মতে, দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সমস্যার সমাধান না করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

বিদেশি বিনিয়োগ টানতে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সর্বশেষ বিনিয়োগ ও নিয়োগ সম্মেলনে দেশ-বিদেশের কয়েকশ প্রতিনিধি অংশ নেন এবং প্রায় ৭১ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়।

তবে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিডা। সংস্থাটির মতে, সংশ্লিষ্ট অনেক দপ্তর নিজস্ব অনলাইন সেবা চালু রাখায় ওয়ান স্টপ সার্ভিসের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাট ও তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছে বিডা।