স্টাফ রিপোর্টার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, নিউজ চ্যানেল বিডি।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত Agreement on Reciprocal Trade (ART) চুক্তির মাধ্যমে পারস্পরিক শুল্ক হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। দীর্ঘ নয় মাসের ধারাবাহিক আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে এই হার কমাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ নং ১৪২৫৭ জারি করে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের উপর Reciprocal Tariff আরোপ করে। পরবর্তীতে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য সংশোধিত হার নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশের জন্য প্রথমে ২০ শতাংশ হার নির্ধারিত হলেও আলোচনার মাধ্যমে তা ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দেয়। এ প্রক্রিয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।
বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত
ART চুক্তিতে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া, বাণিজ্য সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতাসহ বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ পূর্ব থেকেই WTO TRIPS, ILO ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী হওয়ায় নতুন কোনো কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়নি। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।
পোশাক খাতে শূন্য শুল্ক সুবিধা
চুক্তিতে তৈরি পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে তা শূন্য RT হারে বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এ ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক প্রযোজ্য হবে না।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক। ফলে এই সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে খাতটি উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হবে।
২৫০০ পণ্যে শূন্য শুল্ক
চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ২৫০০টি পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য ৭১৩২টি ট্যারিফ লাইন অফার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে:
- ৪৯২২টি ট্যারিফ লাইন চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে
- ১৫৩৮টি ট্যারিফ লাইন পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শূন্য করা হবে
- ৬৭২টি ট্যারিফ লাইন দশ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে
- ৩২৬টি ট্যারিফ লাইন শুল্কমুক্ত সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিধান যুক্ত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিনিয়োগ ও অন্যান্য অঙ্গীকার
চুক্তিতে ই-কমার্সে পার্মানেন্ট মোরাটোরিয়াম সমর্থন, নন-ট্যারিফ বাধা ও কারিগরি প্রতিবন্ধকতা হ্রাস, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, আইপিআর এনফোর্সমেন্ট, কনফর্মিটি অ্যাসেসমেন্ট সার্টিফিকেট ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মেডিক্যাল ডিভাইস ও ফার্মাসিউটিক্যালস আমদানিতে সহজীকরণ, কৃষিপণ্যে SPS ব্যবস্থা স্বীকৃতি, ডেইরি ও মাংসজাত পণ্যে মার্কিন সনদ গ্রহণ, পরিবেশ ও শ্রম আইন বাস্তবায়ন জোরদার করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ডিজিটাল ট্রেড ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা, মার্কিন বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা শিথিল, এবং বোয়িং, LNG, LPG, সয়াবিন, গম ও তুলা আমদানির বিষয়ও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এক্সিট ক্লজ সংযোজন
প্রাথমিক কাঠামোতে চুক্তি বাতিলের সুযোগ না থাকলেও বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমে এক্সিট ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনে চুক্তি থেকে সরে আসার সুযোগ রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত ART চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।





