দীর্ঘ আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের পর নির্বাচন কমিশনের তিন আসনের গেজেট বাতিল, আদালত আদেশে চারটি আসন পুনর্বহাল

মো: মিজানুর রহমান বিশেষ প্রতিনিধি , ১১ নভেম্বর ২০২৫: নিউজ চ্যানেল বিডি গত ৩০ জুলাই নির্বাচন কমিশন বাগেরহাটের চারটি সংসদীয়…

Posted by:

on

মো: মিজানুর রহমান বিশেষ প্রতিনিধি , ১১ নভেম্বর ২০২৫: নিউজ চ্যানেল বিডি

গত ৩০ জুলাই নির্বাচন কমিশন বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে একটি আসন কমিয়ে তিনটি করার প্রাথমিক প্রস্তাব দেয়। এ প্রস্তাব ঘোষণার পরই বাগেরহাটে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়।

নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে চারটি আসন বহাল রাখার দাবি জানালে ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত গেজেটে তিন আসনের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে কমিশন। নতুন সীমানা অনুযায়ী:

  • বাগেরহাট-১: সদর, চিতলমারী, মোল্লাহাট
  • বাগেরহাট-২: ফকিরহাট, রামপাল, মোংলা
  • বাগেরহাট-৩: কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা

এর আগে দীর্ঘদিন ধরে বাগেরহাটে চারটি আসনে নির্বাচন হয়ে আসছিল।

বাগেরহাটের সর্বদলীয় জোট নির্বাচন কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে। ১০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মামলার শুনানি শেষে আদালত বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসন বহাল রাখার রায় দেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে উপকূলীয় জেলার মানুষ আনন্দ প্রকাশ করে।

বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জনাব এম এ সালাম নিউজ চ্যানেল বিডিকে বলেন,

বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জনাব এম এ সালাম নিউজ চ্যানেল বিডিকে বলেন, “বাগেরহাটের সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, হরতাল ও রাস্তাঘাট বন্ধের মতো কর্মসূচি তাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এই আন্দোলন আমাদের এলাকার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন।”

তিনি কিছুটা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “যদিও এই রায়ের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারে, আমরা বাগেরহাটবাসী আশা করি, গণমানুষের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে কমিশন স্বাধীনতার পর থেকে প্রাচীন চারটি সংসদীয় আসন পুনর্বহালের বিষয়টি পূর্ণ বিবেচনা করবে এবং আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। পাশাপাশি এই উপকূলীয় জেলার উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।”

এম এ সালাম উল্লেখ করেন, “বাগেরহাটের চারটি আসন এই এলাকার উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাগেরহাট ঐতিহাসিকভাবে এবং প্রাকৃতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ—এখানে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, অপর্যাপ্ত রাস্তাঘাট এবং দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষকে জর্জরিত করেছে। বিশেষত বাগেরহাট-৩ ও বাগেরহাট-৪ অত্যন্ত রিমোট, নদী ও নালা বেষ্টিত অঞ্চল, সড়ক যোগাযোগ এখনও সীমিত।”

তিনি বলেন, “বাগেরহাট-৩ আসনে রয়েছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মংলা পোর্ট, রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সুন্দরবনের বড় অংশ। কিন্তু রাস্তাঘাটের অনুন্নয়ন ও অন্যান্য জটিলতায় বিগত সরকারের সময়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা কৃষি ও মাছচাষ। শিক্ষার উন্নতি তেমন হয়নি। উন্নয়নের সুফল পেতে হলে আসনগুলো পূর্বের অবস্থায় ফিরে দিতে হবে।”

শেষে এম এ সালাম যোগ করেন, “আমরা আশা করি নির্বাচন কমিশন জনগণের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা দেখাবে এবং চারটি আসনের পুনর্বহাল নিশ্চিত করবে।”

বাগেরহাট-৩ আসনের বিএনপি নমিনেশন প্রত্যাশী এবং কেন্দ্রীয় নেতা  কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম নিউজ চ্যানেল বিডি কে বলেন,

“সাত কর্মদিবসের শুনানির পর আমরা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। নির্বাচন কমিশন আমাদের প্রতি অবিচার করেছে—সংসদীয় একটি আসন কেটে গাজীপুরে স্থানান্তর করেছে। আমরা উচ্চ আদালতে বিচারের জন্য গিয়েছিলাম।”

তিনি জানান, হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ—যার নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি সুশান্ত শেখর সরকার ও বিচারপতি এ ফয়জুল হাসান আরিফ—চারটি সংসদী আসন কমিয়ে তিনটি করার নির্বাচন কমিশনের গেজেটকে অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং চারটি আসন পুনর্বহলের নির্দেশ দিয়েছে। চার ঘণ্টা ব্যাপী জাজমেন্টে আদালত রায় ঘোষণা করে।

শামীম বলেন, “এই রায় উপমহাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এটি প্রমাণ করেছে যে নির্বাচন কমিশন বাগেরহাটবাসীর প্রতি অবিচার করেছে এবং আরপিও ও সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। উচ্চ আদালত জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দিয়েছে। আমরা এই রায়কে স্বাগত জানাই।”

তিনি আরও জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন এবং সিনিয়র সচিবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তারা ধৈর্য সহকারে আদালতের রায় শুনেছেন এবং রায় পাওয়ার পরে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

শামীম বলেন, “এই রায় নির্বাচন ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আরপিও বিধির লঙ্ঘন আদালতের রায়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।”

বাগেরহাট-৪ আসনের বিএনপি থেকে নমিনেশন প্রত্যাশী  জনাব খাইরুজ্জামান শিপন বলেন,

“আমি দুইবার নমিনেশন পেয়েছি—একবার ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং পরে উপনির্বাচনে। আমি বাগেরহাটের চার আসনের মানুষের পালস ভালোভাবে বুঝি। তাদের যে চারটি আসন বিলুপ্ত হয়েছে, সেই আহ্বান ও আল্লাহর কাছে প্রার্থনার ফলস্বরূপ আমরা চারটি আসন ফেরত পেয়েছি। মহান রব্বুল আলামিনের কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”

তিনি আরও বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকেই এই অঞ্চলে চারটি আসন ছিল। আশা করি নির্বাচন কমিশন আদালতের রায় অনুযায়ী চারটি আসন বহাল রাখবে এবং গেজেট প্রকাশ করবে। বাগেরহাটবাসী এই পুনর্বহালের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করেছে। আমাদের আইনজীবী ব্যারিস্টার জাকির অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেছেন, তার প্রতি আমরা ধন্যবাদ জানাই।”

শিপন আরও যোগ করেন, “আমাদের অধিকার ও দাবির কথা নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে। তারা আমাদের আবেগ এবং অধিকারের কথাগুলো মন দিয়ে শুনেছে। হাইকোর্টের রায় বিবেচনা করে তারা সবার সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা আশাবাদী, বাগেরহাটে চারটি আসন স্থায়ীভাবে বহাল থাকবে।”

বাগেরহাট জেলা বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম খান জানান,

“আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাত করেছি। বাগেরহাট জেলার সব দলের নেতা, বিএনপি, জামাতসহ অন্যান্য দলের প্রতিনিধিরা এবং সম্ভাব্য প্রার্থীরা সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও রায় দেখার পরে মিটিং করবেন এবং তার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।”

তিনি বলেন, “আমরা তাদের কাছে বাগেরহাটবাসীর প্রতি যথাযথ সমর্থন দেখানোর অনুরোধ জানিয়েছি। জনগণের প্রাণের দাবির প্রতি কমিশন যেন বিমাতাশুল আচরণ না করে, সেই বিষয়টি আমরা বিশেষভাবে তুলে ধরেছি।”

মনিরুল ইসলাম খান আরও বলেন, “গতকালকে যে রায় হয়েছে, আমরা আমাদের আবেদনের মাধ্যমে আসনের তথ্যচিত্র তুলে ধরেছিলাম। আদালত আমাদের যুক্তি গ্রহণ করেছে এবং নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত গেজেটকে অবৈধ ঘোষণা করে অনতিবিলম্বে সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে। বাগেরহাটবাসী খুবই আনন্দিত যে তাদের আন্দোলন আদালতের মাধ্যমে সফল হয়েছে। এজন্য বাগেরহাটবাসীর পক্ষ থেকে আমরা সকলকে ধন্যবাদ জানাই।”

তিনি জানান, “আদালতের রায়ের কারণে বাগেরহাটে দল-মত নির্বিশেষে আনন্দমিছিল, মিষ্টি বিতরণসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। চারটি আসনের পুনর্বহাল নিয়ে বাগেরহাটের বেশিরভাগ এলাকায় উৎসব এবং স্লোগান মুখরিত হয়েছে।”

ব্যাংক কর্মকর্তা তারেক আহসান বলেন, “বাগেরহাট ঐতিহ্যবাহী জেলা। সুন্দরবন, মংলা আন্তর্জাতিক বন্দর ও ষাট গম্বুজ মসজিদ সহ অনেক দর্শনীয় স্থান এখানে রয়েছে। চারটি আসন কমানোর ষড়যন্ত্র আপাতত শেষ হলো। এই রায় বাগেরহাটবাসীর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিয়েছে।”

বাগেরহাটের মানুষ আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়ে মিছিল, মিষ্টি বিতরণ ও স্লোগান কর্মসূচি পালন করেছে।