“ওপারে ভূমিকম্পের ভয়, এপারে আগুনের ছাই—ঢাকার দুই মুখের দুই গল্প”

“ধনী-গরিবের দুই ভয়: কাঁপছে শহর, পুড়ছে জীবন” কড়াইল বস্তিতে সব হারিয়ে নিঃস্ব কয়েক হাজার পরিবার

স্টাফ রিপোর্টার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫, নিউজ চ্যানেল বিডি।
ঢাকা শহর এই নভেম্বরজুড়ে যেন ভয়ের আরেক নাম। শহরের ওপারের দিকে বিলাসবহুল বহুতল ভবন—যেখানে ভূমিকম্প হলেই সামান্য দুলুনিতে ভীত হয়ে লোকে বেরিয়ে আসে সুশৃঙ্খল সিঁড়ি বেয়ে। কিন্তু এপারেই—করাইলের টিনশেড ঝুপড়িগুলোতে—ভয়টা অন্যরকম; সেখানে ভূমিকম্পের ভয়ের পাশাপাশি প্রতি মুহূর্তেই লেগে থাকে আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। আর এবার সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো।
চলতি মাসে বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। টানা দুলতে থাকা ভবনগুলো পাড়ায়-পাড়ায় এনে দিয়েছে উদ্বেগ, মানুষ টেনশনে রাত কাটিয়েছে খোলা আকাশের নিচে। ভূমিকম্প কত বড় হবে, ভবন টিকবে কি না—এমন অনিশ্চয়তায় শহরজুড়ে এক অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু ভয়টি একটু ভিন্ন ছিল করাইল বস্তির মানুষদের। তাদের ভবন নেই, লিফট নেই, শক্ত কংক্রিটের নিরাপত্তা নেই। তাদের ঘর হলো টিন আর কাঠের অস্থায়ী চার দেয়াল—যা ভূমিকম্পে ভেঙে পড়তে পারে, আগুনে মুহূর্তে পুড়ে যেতে পারে।
তারপর যা হওয়ার তা-ই হলো—গুলশানের করাইল বস্তির আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল হাজারো মানুষের শেষ সম্বল—টাকা-পয়সা, আলমারি, রান্নার হাঁড়িপাতিল, মেয়ের বিয়ের জন্য জমিয়ে রাখা শাড়ি, ছেলের স্কুলের বইখাতা—সব যেন এক মুহূর্তেই উধাও। আগুনের কালো ধোঁয়ার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশছোঁয়া বহুতলগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল—হয়তো দুই শহর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে: এক শহর সাচ্ছন্দ্যের, আরেক শহর সংগ্রামের।
একদিকে ধনী মানুষের ভয়—বিল্ডিং কাঁপছে, নেমে আসতে হবে কি না; অন্যদিকে গরিব মানুষের ভয়—আগুন ছড়িয়ে গেলে পালানোর পথ মেলে কি না। ধনী পরিবারগুলো নিরাপদ খালি জায়গায় দাঁড়িয়ে ভূমিকম্পের খবর দেখে ফেলে, গরিব পরিবারগুলো ছবি তুলতে আসা মানুষের পাশ দিয়ে তাকিয়ে দেখে, “সবকিছু শেষ!”
এই দুই ভয়ের দুই রূপ—শহরের দুই প্রান্তে দুই জীবনের ব্যবধানকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি কম হলেও মানসিক আতঙ্ক কেঁপে উঠেছে সব শ্রেণির মানুষদের। কিন্তু আগুনের ক্ষতি—তা কেবল করাইলের মানুষই টের পাচ্ছে প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি জমে থাকা অশ্রুতে।
করাইল বস্তির একজন ক্ষতিগ্রস্ত নারী ধ্বংসস্তূপের ওপর বসে বলছিলেন, “ভূমিকম্প হলে আমরা টিনের ঘরটা ধরে থাকি। আগুন লাগলে ধরে থাকবারও কিছু থাকে না।” তার কথায় যেন উঠে আসে পুরো শহরের দুই ভাগ—এপার-ওপারের দুই ভয়।
এই শহরে নিরাপত্তার ব্যবধান বারবার প্রমাণ করে দেয়—ভয় সবাইকে সমানভাবে ছুঁয়ে যায় না। কারও ভয় সামলে ওঠার মতো কাঠামো আছে, সম্পদ আছে, কারও আছে শুধু দুটি হাত—আর চোখের সামনে পুড়ে যাওয়া জীবনের অবশিষ্ট স্মৃতি।