নিজস্ব প্রতিবেদক │ নিউজ চ্যানেল বিডি │ ঢাকা, ৬ নভেম্বর ২০২৫
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বৈঠকে “গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫”–এর চূড়ান্ত অনুমোদন, জাতীয় লজিস্টিক নীতি ২০২৫–এর খসড়া অনুমোদন, জাতীয় নগর নীতি নিয়ে আলোচনা, এবং ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকা অনুমোদন দেওয়া হয়।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫: মানবাধিকার সুরক্ষায় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
বহুল আলোচিত “গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫”–এর মাধ্যমে বাংলাদেশে গুমকে চলমান অপরাধ (Continuous Offense) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যেখানে মৃত্যুদণ্ডসহ সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশে উল্লেখযোগ্য বিধানসমূহ:
গোপন আটক কেন্দ্র (আয়নাঘর) স্থাপন বা ব্যবহারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্ত ক্ষমতা প্রদান
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন ও ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্নের বাধ্যবাধকতা
ভুক্তভোগী, সাক্ষী ও তথ্যদাতার সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ ও আইনগত সহায়তা নিশ্চিতকরণ
গুম প্রতিরোধ তহবিল ও তথ্যভান্ডার প্রতিষ্ঠা
এই অধ্যাদেশ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রণীত হয়েছে, বিশেষ করে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’–এর আলোকে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন,
“এই আইন এমন এক কাঠামো তৈরি করবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার নাগরিকদের গুম করার মতো মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে।”
জাতীয় লজিস্টিক নীতি ২০২৫: নদী ও রেলকেন্দ্রিক উন্নয়ন
একই বৈঠকে জাতীয় লজিস্টিক নীতি ২০২৫–এর খসড়াও অনুমোদন পায়। এই নীতির লক্ষ্য হলো দেশের পরিবহন ব্যবস্থা থেকে রোড–সেন্ট্রিক নির্ভরতা কমিয়ে নদী ও রেলওয়ে–নির্ভর টেকসই উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলা।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন,
“আমরা একসময় নদীমাতৃক দেশ ছিলাম, কিন্তু অযথা সড়ক ও সেতু উন্নয়নের নামে আমরা বহু নদী হারিয়েছি। এখন থেকে কোনো নদীর ক্ষতি না করেই উন্নয়ন এগিয়ে নিতে হবে।”
নীতির মূল ফোকাস:
রেলওয়ে অবকাঠামোর সর্বাধিক ব্যবহার ও সম্প্রসারণে গুরুত্ব
নৌপরিবহনের নেভিগেশন সক্ষমতা রক্ষা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি
পরিবেশবান্ধব ও মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট নীতিমালা বাস্তবায়ন
ডিজিটাল ই–কাস্টমস ও ই–ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম চালু
এই নীতির ফলে দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহন সময় ও খরচ হ্রাস, এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্বাচন ও আইআরআই প্রতিবেদন বিষয়ে সরকারের অবস্থান
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জানায়—
“সরকার নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে। আইআরআই-এর যে আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, সে বিষয়ে সরকার অবগত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন,
“রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত আছে। তারা যদি নিজেরা সমঝোতায় না পৌঁছায়, তবে অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।”
ছুটির তালিকা ও অন্যান্য সিদ্ধান্ত
বৈঠকে ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকাও অনুমোদন দেওয়া হয়। আগামী বছরে মোট ২৮ দিন ছুটি থাকবে, যার মধ্যে ৯ দিন সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলেছে। ফলে কার্যকর ছুটি হবে ১৭ দিন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর সংক্ষেপ
গুম তদন্তে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, “বেশিরভাগ সংস্থা সহযোগিতা করছে, যা কমিশনের রিপোর্টেও প্রতিফলিত হয়েছে।”
ক্ষতিপূরণ তহবিল বিষয়ে তিনি জানান, গুম প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারি তহবিল থেকেই অর্থায়ন করা হবে।
আইন বাস্তবায়নের বিধিমালা শিগগিরই আইন মন্ত্রণালয় প্রকাশ করবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এই মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা, টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন ও নির্বাচনী প্রাতিষ্ঠানিকতা—এই তিন ক্ষেত্রে এক নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি হলো।





