জুলাই অভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আগামী ১৭ নভেম্বর (রবিবার) এই মামলার রায় ঘোষণা করবে ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বৃহস্পতিবার রায়ের এ তারিখ ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
গত ২৩ অক্টোবর অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।
এই মামলায় শেখ হাসিনার সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনও আসামি। এদের মধ্যে মামুন দায় স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন এবং বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর অভিযোগে গত ১০ জুলাই ট্রাইব্যুনাল এই তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।
এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলার বিচার শুরু হয়— সেই ট্রাইব্যুনালেই, যা একসময় তার সরকারই গঠন করেছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার করার জন্য।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। এরপরই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা দায়ের করা হয়।
প্রসিকিউশন ১ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। মোট পাঁচটি অভিযোগে বলা হয়—
১. ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান,
২. হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ,
৩. রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা,
৪. রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা,
৫. আশুলিয়ায় ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে চলে যান। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও ভারতে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের ‘পলাতক’ দেখিয়ে মামলার বিচার চলে।
একমাত্র কারাবন্দি আসামি, সাবেক আইজিপি মামুন ১০ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে রাজসাক্ষী হন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ১২ অক্টোবর যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। প্রসিকিউশন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে, অন্যদিকে তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী খালাসের আবেদন জানান।
অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান যুক্তিতর্কে বলেন, “যদি এই দুই আসামির বিচার না হয়, তাহলে জাতি কাপুরুষ হয়ে যাবে। আদালত যেন সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করে।”
এদিকে, শেখ হাসিনার রায় ঘোষণাকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে রাজধানীজুড়ে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এরই মধ্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত বোমা বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় কড়া নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। সেনাবাহিনী, বিজিবি, এপিবিএন ও পুলিশের বিপুল সদস্য মোতায়েন রয়েছে। হাই কোর্ট মাজার সংলগ্ন এলাকায় টহল চালানো হচ্ছে এবং প্রবেশপথে স্থাপন করা হয়েছে একাধিক চেকপোস্ট।
ঢাকার প্রবেশমুখে তল্লাশি চলছে, পাশাপাশি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৭ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।





