বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যমিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন

“রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার”

ছবি:প্রধান উপদেষ্টার ফেইসবুক থেকে সংগ্রহীত

Posted by:

on

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | জাতিসংঘ সদর দপ্তর, নিউইয়র্ক

মাননীয়া সভাপতি, মহামান্যবৃন্দ,

গণহত্যা শুরুর আট বছর পরও রোহিঙ্গাদের দুর্দশা অব্যাহত রয়েছে। এ সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগের অভাব দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক তহবিলেও দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ ঘাটতি।

রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। এর সমাধানও সেখানে নিহিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করে এবং তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। সংকটের একমাত্র সমাধান এটাই। এটিকে মিয়ানমারের সামগ্রিক সংস্কারের জিম্মি করে রাখা উচিত নয়।

যেহেতু তহবিল কমে যাচ্ছে, তাই একমাত্র শান্তিপূর্ণ সমাধান হলো প্রত্যাবাসন শুরু করা। আন্তর্জাতিক সুরক্ষা অব্যাহত রাখার তুলনায় প্রত্যাবাসনে অনেক কম সম্পদ প্রয়োজন হবে। রোহিঙ্গারা বারবার তাদের ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে, সম্প্রতি সংঘাত থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের অবিলম্বে ফেরত নেওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ এ সংকটের শিকার। আমাদেরকে বহন করতে হচ্ছে বিপুল আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত খরচ। রোহিঙ্গাদের আগমনের সাথে সাথে মাদক প্রবাহসহ নানা অপরাধমূলক কার্যক্রম রাখাইন থেকে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা আমাদের সামাজিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলছে।

আমাদের উন্নয়নমূলক চ্যালেঞ্জ—যেমন বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কথা বিবেচনা করলে—বাংলাদেশের ভেতরে রোহিঙ্গাদের কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ আমরা দিতে পারি না।

সংকটের একটি টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আমি নিম্নলিখিত কর্মসূচি প্রস্তাব করছি:

প্রথমত, রাখাইনে যুক্তিসঙ্গত স্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করা;

দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করা এবং তাদের টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা—প্রথমেই যারা সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছে এবং যারা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত;

তৃতীয়ত, রাখাইনকে স্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোগাড় করা এবং সেখানে আন্তর্জাতিক বেসামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করা;

চতুর্থত, রোহিঙ্গাদের রাখাইন সমাজ ও প্রশাসনে টেকসই একীভূতকরণের জন্য আস্থা গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করা;

পঞ্চমত, যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনাকে (Joint Response Plan) পূর্ণ তহবিল জোগাতে দাতাদের সহায়তা নিশ্চিত করা;

ষষ্ঠত, জবাবদিহিতা ও পুনরুদ্ধারমূলক বিচার নিশ্চিত করা; এবং

সপ্তমত, মাদক অর্থনীতি ধ্বংস করা ও সীমান্তপারের অপরাধ মোকাবিলা করা।

বিশ্ব আর রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার জন্য অপেক্ষায় ফেলে রাখতে পারে না।

আজ আসুন, আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি—এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব। বাংলাদেশ এ লক্ষ্যে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।