স্টাফ রিপোর্টার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, নিউজ চ্যানেল বিডি।
রাজশাহীর তানোরের ছোট্ট গ্রামটি—যেখানে কোলাহল মানে ছিল শিশুদের হাসি, মাঠে লুকোচুরি, আর কৃষকের সাধারণ দিনের ব্যস্ততা—সেই পরিচিত গ্রাম দুদিন ধরে যেন নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিল একটিমাত্র নামের জন্য: সাজিদ।
মাত্র দুই বছর বয়স। যে বয়সে পৃথিবীটা তার কাছে ছিল রঙিন খেলাঘর। মাটি ছুঁয়ে দৌড়ানো, ফুল ছিঁড়ে মায়ের কোলে ফেরা—এইসব স্বাভাবিক আনন্দের মাঝেই হঠাৎ তাকে পড়ে যেতে হলো এক অন্ধকার, বিপজ্জনক গভীর নলকূপের গর্তে।
অন্ধকার গর্তে ৩২ ঘণ্টা—মানবিক লড়াইয়ের গল্প
“বাচ্চাটা পড়ে গেছে!” এই চিৎকারে পুরো গ্রামের হৃদয় কেঁপে উঠেছিল।
তারপর শুরু হলো এক দীর্ঘ, ক্লান্তিহীন মানবিক সংগ্রাম। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা, স্থানীয় মানুষজন, প্রশাসনের লোকেরা—সবাই ছুটে এলেন। রাত গড়াচ্ছে, আবার ভোর হচ্ছে—কেউ থামছেন না।
একটি শিশুকে বাঁচানোর লড়াই যেন পুরো দেশের লড়াই হয়ে উঠেছিল।
গর্তের গভীরে তখন ছোট্ট সাজিদ—এক টুকরো দেহ, একরাশ অন্ধকার, আর একটি নিঃশব্দ অপেক্ষা।
উদ্ধারের মুহূর্ত—যেন আলো ফিরে এল
অবশেষে ৩২ ঘণ্টার টানটান উত্তেজনার শেষে রাত ৮টা ৫০ মিনিটে উদ্ধারকারীরা সাজিদকে জীবিত অবস্থায় টেনে তুললেন।
মুহূর্তেই পুরো এলাকা উল্লাসে ভরে গেল। মায়ের কান্না আনন্দে রূপ নিল। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা শিশুটিকে অ্যাম্বুলেন্সে তুললেন।
সবার চোখে তখন একই আশা— বাঁচবে সাজিদ।
শেষরক্ষা হলো না—রামেকে এসে থেমে গেল জীবন
জরুরি ভিত্তিতে নিয়ে যাওয়া হলো রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক)। কিন্তু কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকেরা জানালেন— সাজিদ আর নেই।
এই একটি বাক্য ভেঙে দিল ৩২ ঘণ্টার আশার স্তম্ভ। গ্রামের মানুষ নির্বাক হয়ে গেল।
একটি শিশুকে হারানোর বেদনা—একটি গ্রামের দীর্ঘশ্বাস
তানোরের আজকের দৃশ্য—রাস্তাগুলো থমথমে, ঘরগুলো নীরব। মানুষেরা বলছে— “এত চেষ্টা করেও বাঁচানো গেল না ওকে…”
শিশুরা খেলা ছেড়ে বসে আছে। মায়েরা সন্তানদের আরও শক্ত করে কোলে নিচ্ছেন।
ফায়ার সার্ভিস—মানবতার অবিনশ্বর প্রতীক
- সারারাত গর্তের পাশে ছিলেন
- নতুন প্রযুক্তি, ক্যামেরা, রশি—সব ব্যবহার করেছেন
- নিজের জীবন-ঝুঁকি নিয়ে মাটি খুঁড়েছেন
- এক মুহূর্তও হাল ছাড়েননি
শুধু একটি কথা মনে নিয়ে— “সাজিদকে বাঁচাতে হবে।”
শেষে রয়ে গেল শুধু দীর্ঘশ্বাস
জীবন কখনো আনন্দ দেয়, কখনো নির্মমভাবে ছিনিয়ে নেয় হাসি। সাজিদের গল্পটি তেমনই—উদ্ধারের আনন্দ হাজার মানুষের বুক ভরিয়েছিল, কিন্তু হাসপাতালের করিডোরে নিভে গেল সেই আলো।
একটি পরিত্যক্ত নলকূপের গর্ত—একটা অসতর্কতা—পুরো দেশকে শিখিয়ে গেল সতর্কতার মূল্য।





