দেশের মানুষের জন্য নিজের কর্মপরিকল্পনা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরে সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন

শনিবার দুপুরে বনানীর হোটেল শেরাটন-এর বলরুমে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে (বিএনপি)–র চেয়ারম্যান তার এই কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।


‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’

তারেক রহমান বলেন,

“আগামী নির্বাচনে ইনশাল্লাহ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। ২৫ তারিখে দেশে এসে আমি বলেছিলাম— মার্টিন লুথার কিং যেমন বলেছিলেন আই হ্যাভ এ ড্রিম, আমি বলেছি আই হ্যাভ এ প্ল্যান।”

তিনি জানান, এই পরিকল্পনার একটি বড় অংশ বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী—নারীদের ঘিরে।


‘ফ্যামিলি কার্ড’ পরিকল্পনা

তারেক রহমান বলেন,

“বাংলাদেশের হাফ পপুলেশন নারী। তাদের ঘিরেই আমাদের ফ্যামিলি কার্ড পরিকল্পনা। একজন নারী—গৃহিণী বা হাউসওয়াইফ—এই কার্ড পাবেন। এটি সারাজীবনের জন্য নয়; ৫ থেকে ৭ বছরের জন্য দেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে আমরা তাকে সাপোর্ট দেব।”

তিনি জানান,

  • বাংলাদেশে আনুমানিক ৪ কোটি পরিবার রয়েছে
  • গড়ে একটি পরিবারে ৫ জন সদস্য ধরা হয়েছে
  • প্রতিটি পরিবার একটি করে কার্ড পাবে
  • লক্ষ্য: নারীদের শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কর্মসূচি

চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের দিনের প্রথম কর্মসূচি ছিল সাংবাদিকদের সঙ্গে এই শুভেচ্ছা বিনিময়। এতে জাতীয় দৈনিক, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।


‘সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক’

তিনি বলেন,

“একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে মনে হয় সামনে আমাদের অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ আছে। আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেগুলো আলোচনা ও আলাপের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন,

“যেকোনো মূল্যে আমাদের ডেমোক্রেটিক প্রসেস চালু রাখতে হবে—জাতীয় পর্যায় থেকে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, এমনকি ট্রেড বডির নির্বাচন পর্যন্ত।”


‘আসুন দেশের মানুষের জন্য কাজ করি’

তারেক রহমান বলেন,

“কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীকে আঘাত না করেই বলতে চাই— আসুন আমরা দেশের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর অধিকার, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করি।”

তিনি সংস্কার প্রসঙ্গে বলেন,

  • সাংবিধানিক সংস্কার
  • আইনগত সংস্কার
  • মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তা—এই তিনটি দিককে সমান গুরুত্ব দিতে হবে

‘নির্বাচনী প্রচারণা শুরু ২২ জানুয়ারি’

তিনি জানান,

“আমি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। স্বাভাবিকভাবেই ২২ জানুয়ারি থেকে আমরা আমাদের সব পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের সামনে যাব।”


‘আলোচনা-সমালোচনা দুইটাই চাই’

তারেক রহমান বলেন,

“আমরা সরকার গঠন করতে পারলে আপনাদের কাছ থেকে এমন আলোচনা-সমালোচনা চাই, যা দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে আমাদের সাহায্য করবে— শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা নয়।”


‘৫ আগস্টে ফিরে যেতে চাই না’

তিনি বলেন,

“৫ আগস্টের আগে ফিরে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। হিংসা, প্রতিশোধ আর বিভেদের পরিণতি কী হতে পারে আমরা দেখেছি।”

তিনি আহ্বান জানান,

“মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু তা যেন কখনো মতবিভেদে রূপ না নেয়।”


‘দেশে কী হয়েছে আমি জানি’

তারেক রহমান বলেন,

“আমি দীর্ঘদিন দেশে থাকতে পারিনি, কিন্তু দেশের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, দলের নেতাকর্মীদের কষ্ট, এমনকি আমার পরিবারের ওপর যা ঘটেছে—সবকিছুই আমি জানি।”


‘নতুন প্রজন্ম দিকনির্দেশনা চায়’

তিনি বলেন,

“নতুন প্রজন্ম শুধু নয়, সব প্রজন্মই এখন একটি গাইডেন্স ও আশার দিকনির্দেশনা খুঁজছে।”


যুক্তরাজ্যের উদাহরণ

যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে দেখা একটি নির্বাচনী বিতর্কের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন,

“ওখানে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ২০ মিনিটে আসে— একজন বলছে ১৯ মিনিটে নামাবে, আরেকজন বলছে ১৫ মিনিটে। জনগণের সেবার মান উন্নয়নই ছিল তাদের মূল বিতর্ক।”

তিনি আক্ষেপ করে বলেন,

“বাংলাদেশে, এমনকি ঢাকা শহরেও একটি কার্যকর অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস গড়ে তুলতে পারিনি— এটা খুব দুঃখজনক।”


পানি সংকটের সতর্কতা

তারেক রহমান বলেন,

“১০–১৫ বছর পরে ঢাকা শহরে পানির ভয়াবহ সংকট দেখা দিতে পারে। বুড়িগঙ্গা পুরোপুরি দূষিত, শীতলক্ষ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ দূষিত, মেঘনাও ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে।”


কর্মসংস্থান ও তরুণ সমাজ

তিনি বলেন,

“২০ কোটির মানুষের দেশে তরুণ সমাজের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারলে আমাদের সব অর্জন অর্থহীন হয়ে যাবে।”


সড়ক দুর্ঘটনা ও সামাজিক নিরাপত্তা

তারেক রহমান বলেন,

“গত বছরে প্রায় ৭ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। অধিকাংশই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের পরিবার কীভাবে বাঁচবে—এই প্রশ্ন আমাদের ভাবতে হবে।”


কৃষকদের কথা

তিনি বলেন,

“২০ কোটি মানুষের খাদ্য জোগানো কৃষকদের কথা আমাদের জানতে হবে। তাদের বলার কোনো ভেন্যু নেই— সেই দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে।”


দুর্নীতি ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ

তারেক রহমান বলেন,

“দুর্নীতি যেন স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে— সেটিকে ধীরে ধীরে কমাতে হবে।”
“জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করলে কোনো সম্পদই যথেষ্ট হবে না।”

তিনি জানান,

  • ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা
  • এর ৮০–৮৫ শতাংশ নারী
  • পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোই লক্ষ্য

অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, উপদেষ্টা ও নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল ও চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী।