জুলাই সনদে বিএনপির আপত্তি: ‘জাতির সঙ্গে প্রতারণা, ভিন্নমত উপেক্ষিত’ — মির্জা ফখরুল

জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের আলোচনায় একাধিক দফা অগোচরে সংশোধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ বিএনপি মহাসচিবের

Posted by:

on

মো: মিজানুর রহমান | নিউজ চ্যানেল বিডি | ঢাকা, ৩০ অক্টোবর ২০২৫, বৃহস্পতিবার

বিএনপির রাজনৈতিক এজেন্ডা ও জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার গুলশান চেয়ারপারসন কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,
“জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫–এর মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। ভিন্নমত ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে চূড়ান্ত সনদ তৈরি করা হয়েছে।”


🔹 বিএনপির অবস্থান: সংস্কারই মূল রাজনৈতিক এজেন্ডা

মির্জা ফখরুল বলেন,
“দীর্ঘ ১৬ বছরের ফয়সালা-বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়।
এই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক সংস্কারের এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দেয়।”

তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি ২০২৩ সালে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফা ঘোষণা করে।
এর আগে ২০২২ সালে ২৭ দফা ও ২০১৭ সালে ভিশন ২০৩০ প্রকাশ করেছিল দলটি।
“অতএব, রাষ্ট্র কাঠামোর প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কার বিএনপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা,” বলেন তিনি।


🔹 সংস্কার কমিশন ও ঐক্যমত্য কমিশনের আলোচনা

বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক ঘোষিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের সঙ্গে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই আলোচনা থেকেই জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন গঠিত হয়, যার সভাপতি বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি জানান, “প্রধান উপদেষ্টা প্রথম বৈঠকে বলেছিলেন,
সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত্যে গৃহীত প্রস্তাবগুলো নিয়ে একটি জাতীয় সনদ তৈরি হবে, যা নির্বাচিত সংসদে বাস্তবায়ন করা হবে।
কিন্তু পরে দেখা গেলো, ঐক্যমত্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দফা আমাদের অজান্তে সংশোধন করা হয়েছে।”


🔹 বিএনপির অভিযোগ: চূড়ান্ত সনদে ‘অগোচরে সংশোধনী’

মির্জা ফখরুল বলেন,
“১৭ অক্টোবর সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আমরা অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছিলাম।
কিন্তু চূড়ান্ত কপি আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি।
পরে প্রিন্টেড কপি হাতে পেয়ে দেখি,
বঙ্গবন্ধুর ছবি টানানোর বিধান বাতিল, সংবিধানের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল বিরুপ্ত করার মতো বিষয়ে ঐক্যমত্য থাকলেও সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন,
“এতে প্রতীয়মান হয়, এক বছরের আলোচনাটি অর্থহীন ছিল—
এটি সময় ও অর্থের অপচয়, এবং জাতির সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।”


🔹 ‘আদেশ’ জারির এখতিয়ার প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব

বিএনপি মহাসচিব বলেন,
“জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সরকার যে ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি করতে যাচ্ছে, তা অসাংবিধানিক।
আদেশ আইনের মর্যাদা রাখে, তাই এটি জারি করার এখতিয়ার কেবল রাষ্ট্রপতির, সরকারের নয়।”

তিনি আরও জানান,
“অন্যদিকে বিকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিষয়গুলো গণভোটে উপস্থাপন করা হবে—
কিন্তু এতে ভিন্নমত বা নোট অফ ডিসেন্ট উল্লেখ করা হয়নি।
এটি একতরফাভাবে জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।”


🔹 গণতন্ত্রে ভিন্নমত স্বাভাবিক, কিন্তু উপেক্ষিত

মির্জা ফখরুল বলেন,
“গণতন্ত্রে ভিন্ন মত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু ঐক্যমত্য কমিশন সেই অধিকারকে আমলে নেয়নি।
ফলে সংলাপ ও আলোচনার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে।”


🔹 প্রশ্নোত্তর পর্বে: খুন-হত্যার বিচার ও ফেব্রুয়ারির নির্বাচন

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন,
“জুলাই-আগস্টে যারা খুন-হত্যায় জড়িত ছিল—
সে সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী বা আওয়ামী লীগের কর্মী—
তাদের বিচার হতে হবে। আমরা সেই বিচার চাই।”

ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,
“মধ্য ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা সরকারের প্রতিশ্রুতির ওপর আমরা আস্থা রাখছি।
বিএনপি সেই অনুযায়ী নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।”


🔹 বিএনপির দাবি: জুলাই সনদে স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক সম্মান নিশ্চিত হোক

শেষে মির্জা ফখরুল বলেন,
“আমরা চাই জুলাই সনদে যেসব দফা ঐকমত্যে গৃহীত হয়েছিল, সেগুলো অক্ষুণ্ন রাখা হোক।
ভিন্নমত ও গণতান্ত্রিক আলোচনা যেন সম্মান পায়—এটাই এখন সময়ের দাবি।”