মানবতাবিরোধী হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিলেন এক ভুক্তভোগী বাবা

মাথায় গুলিবিদ্ধ শিশুসন্তানকে নিয়ে আদালতে হাজির, করলেন আবেগঘন জবানবন্দি

Posted by:

on

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫

মানবতা বিরোধী হত্যা মামলার সাক্ষ্য দিয়েছেন এক ভুক্তভোগী বাবা।
আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মাথায় এপাশ থেকে ওপাশে গুলি ভেদ হয়ে যাওয়া শিশুসন্তানকে নিয়ে উপস্থিত হন এবং তার জবানবন্দিতে নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো—


আমার নাম মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান।
আমি বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি ব্যবসা করি। আমার একটি দোকান আছে।

১৯-০৭-২০২৪ ইং তারিখে শুক্রবার বিকাল আনুমানিক ৩.০০/৩.৩০টার সময় আমার বাবাকে খাবার পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমার ছেলে মোঃ বাতিস খান মুস্তা (৬) আইসক্রিম খেতে চায়। তখন আমি আমার মা ও আমার ছেলেকে নিয়ে বাসার নিচে নামি। মা কে বলি আইসক্রিম কিনে দেওয়ার পর আমার ছেলেকে নিয়ে বাসায় চলে যাবে। বাসার নিচে নামার পর গেইটের বাইরে থেকে পুলিশের ছোঁড়া একটি গুলি আমার ছেলের মাথায় লেগে মাথা ভেদ করে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়।

তৎক্ষনিকভাবে আমি আমার ছেলে কে কোলেই করে পার্শ্ববর্তী ফেমাস হাসপাতালে নিয়ে যাই।
আমার বাসা থেকে আনুমানিক ৭০ ফিট দূরে রামপুরা থানা। আমি আমার বাসার গেট থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম ওই থানার ওসি মশিউর রহমান তার সঙ্গে আরো কয়েক জন পুলিশ সদস্য সরাসরি গুলি করেছিল। ফেমাস হাসপাতালে তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত আমার ছেলেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে কল করি।

আমি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সন্ধ্যা আনুমানিক ৭.০০টার দিকে আমরা হাসপাতালে পৌঁছাই। কোন কারণে আমার বাবা ও স্ত্রী ঢাকা মেডিকেল কলেজে আসেন। আমার ছেলের মাথায় ডাক্তাররা অপারেশন করে।

তখন আমি আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছিনা না। তাকে বার বার ফোন করেও পাইনি। পরবর্তীতে আমার এক প্রতিবেশীকে ফোন করে আমার ফ্লাটে গিয়ে আমার মায়ের খোঁজ করতে বলি। তিনি আমাকে জানান যে, আমার ছেলের মাথা যে গুলিটি লেগেছিল সেই গুলিটি আমার ছেলের মাথা ভেদ করে আমার মায়ের পেটে লেগেছে। আমি তৎক্ষনিকভাবে আমার ছেলেকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আমার মায়ের গুলি লাগার বিষয়টি জানতে পারিনি। তিনি আমাকে আরো জানান, তারা আমার মাকে তৎক্ষনিকভাবে ফরাজী হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। তিনি এখন সেবা নেয়া চিকিৎসাধীন আছেন। আমি যেন আমার কোন আত্মীয়কে আমার মায়ের কাছে ফরাজী হাসপাতালে পাঠাই।

আমার স্ত্রী বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই আমার মাকে প্রতিবেশীর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কারনে আমার স্ত্রী আমার মায়ের গুলি লাগার সংবাদ জানাতে পারেনি।

বাইরে অনেক জল্পনা তৈরি হওয়ায় আমরা কেউ ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে বের হয়ে ফরাজী হাসপাতালে যেতে পারিনি। আমি আমার মাকে আত্মীয়কে ফোন করে দ্রুত ফরাজী হাসপাতালে যেতে বলি এবং তিনি তা সঙ্গে ফরাজী হাসপাতালে যান। এই রাতে তিনি সারোয়ার হোসেন। তিনি দেখে নেন, আমার মায়ের অবস্থা। ডাক্তাররা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। গাড়ি না পাওয়ায় তিনি আমার মাকে ঢাকা মেডিকেল আনার পারেন নি। বাইরে তখন অনেক জল্পনা ছড়িয়েছিল। ঐ দিন রাত ১১.০০টায় আমি আমার বাবাকে ফরাজী হাসপাতালে পাঠাই। রাতে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় বাবাকে ঢাকা মেডিকেল আনার পারিনি। পরদিন সকাল ৭.০০টায় আমি ঢাকা মেডিকেল থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ফরাজী হাসপাতালে যাই। ঐ অ্যাম্বুলেন্সে করে বাবা মাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে আসেন। পরবর্তীতে মায়ের অবস্থা ধীরগতিতে যায়। হাসপাতালে নামানোর পর ডাক্তাররা মায়ের ইসিজি করেন এবং তাকে মৃত ঘোষণা করেন। (এ পর্যন্ত সামনে কার্ডি ভেন্ট পড়েছে।) আমার মায়ের লাশ মরলে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আমার ছেলে আইসিইউতে ছিল। আমি আমার মায়ের লাশের সাথে থাকতে পারিনি।

লাশ নিতে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ জানান, যেহেতু সে রামপুরা থানা এলাকায় গুলি হয়েছে, তাই লাশ নিতে হলে রামপুরা থানা পুলিশের অনুমতি লাগবে। আমি রামপুরা থানার উপরি মোবাইল নম্বরসহ করে ফোন করি এবং তারা অনুমতি দান করে। থানা থেকে একজন পুলিশ সদস্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠাতে। ২০-০৭-২০২৪ ইং তারিখে দুপুরে আমি ঢাকা মেডিকেল থেকে একজন কে মোটর সাইকেলে রামপুরা থানায় পাঠাই। দুজন সাব-ইন্সপেক্টর সিভিল পোশাকে ঢাকা মেডিকেলে আসে। তারা বলেন, এখন লাশটি তাড়ি পাঠানো যাবে না। অনেক অনুরোধের পরও তারা লাশ দিতে রাজি হননি। পরবর্তীতে তারা এই শর্তে রাজি হয় যে, লাশ নিয়ে রামপুরা যাবে না। তাদের কল্পনায় আমার ছেলে টাইমিংস মিশনার থানার গ্রামে বাড়িতে নিয়ে যাব। আমার ছেলে আইসিইউতে থাকায় আমি আমার মায়ের লাশের সাথে যেতে পারিনি।

আমার ছেলে ২৬-০৮-২০২৪ তারিখ পর্যন্ত আইসিইউতে ভর্তি ছিল। এরপর তাকে মেডিকেলসেন্টার দিয়ে যাওয়া হয়। পরে সে ২২-১০-২০২৪ তারিখ পর্যন্ত আইসিইউতে ভর্তি ছিল। তার অবস্থার অনুযায়ী হতে থাকলে চিকিৎসকরা তাকে সিংগাপুরের চিকিৎসার জন্য পাঠানোর পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে চ্যানেল আই অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা করে দেয়। ২৩-১০-২০২৪ তারিখ থেকে ০৩-০৪-২০২৫ তারিখ পর্যন্ত ছেলে সিংগাপুরে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তার সব চিকিৎসার খরচ সরকার বহন করেন। সিংগাপুর থেকে তাকে আবার সিঙ্গাপুরে অবরোধবিনিময়ে রাখা হয় ০১-০৭-২০২৫ পর্যন্ত। ০১ জুলাই তাকে পুনরায় সিংগাপুরে নেওয়া হয়। এরপর সে ২৬ জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত সিংগাপুরে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।

সিংগাপুর থেকে আনা খাবার আমার ছেলে এনজিটিভারের মাধ্যমে নাক দিয়ে গ্রহণ করে। আমার ছেলের দানপিপি এখন প্যারালাইজড। সে কথাও বলতে পারে না। চলাফেরাও করতে পারে না। তাকে ট্রায়ালরুমে এলার্জি অনুযায়ী তার মাথায় উপর ক্ষতচিহ্ন ও চিকিৎসার সরঞ্জামাদি দেখা যায়।

আমি রামপুরা থানার তৎকালীন সরাসরি অজ্ঞ হাতে গুলি করতে দেখেছি। সেখানে আরো অনেক পুলিশ ছিল। পরবর্তীতে জানাতে পেরেছি সেদিকেন চন্দ্রনা নামে একজন পুলিশ ছিল।

আমার মায়ের হত্যা এবং আমার সন্তানের এই অবস্থা করার জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার চাই।