স্মরণীয় ২৮ অক্টোবর: সাংবাদিক মিজানুর রহমানের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভয়াবহ সেই দিনগুলো

২০১৭ সালে বেগম খালেদা জিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর কাভার করতে গিয়ে জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি, ২০২৩ সালের নয়া পল্টনের সংঘাতে বুলেটের আঘাত — ২৮ অক্টোবর যেন প্রতি বছরই সাংবাদিক মিজানুর রহমানের জীবনে ফিরে আসে এক ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে।

Posted by:

on

২৮ শে অক্টোবর—ভিন্ন ভিন্ন কারণে আমার কাছে নানা ভাবে স্মরণীয়।
বছর আটেক আগের কথা, ২০১৭ সাল। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের জন্য ঢাকা থেকে রওনা দেন। রাস্তার দুপারে হাজার হাজার মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকার, তাদের নেতাকর্মী এবং পুলিশের নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা, হামলা—কোনো কিছুই মানুষের ঢলকে থামাতে পারেনি।

যখন আমরা ঢাকা থেকে নরসিংদীতে যাচ্ছি, তখন আড়াইহাজারে সাংবাদিকদের গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আহত হন বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী। গাড়ি ছুটছে ফেনীর দিকে, আমরাও ছুটছি। ফেনী ঢোকার পথে সাংবাদিকদের গাড়ি লক্ষ্য করে হলো এক ভয়াবহ হামলা। আমি গাড়ির সামনে বসে চিত্র ধারণ করছিলাম, পিছনে বসেছিলেন শ্রদ্ধেয় প্রিয় বড় ভাই তৌহিদ শান্ত। আমরা দুজনই তখন নিউজ টোয়েন্টিফোরে কর্মরত।

চ্যানেল আইয়ের গাড়িতে লক্ষ্য করে তিন ফিট লম্বা কাঠের একটি টুকরা ছুটে এসে গ্লাস ভেঙে দেয়। আরেকটি কাঠের টুকরা আমাদের গাড়ির দিকে আসে। আমাদের চালক জীবনে প্রথমবার ঢাকার বাইরে ট্যুরে বের হয়েছিলেন—তাও আবার বেগম জিয়ার বহরে। তিনি এমনভাবে গাড়ি ঘুরিয়ে দেন যে বাম পাশের দুই চাকা প্রায় উঠে যায়। গাড়ি তখন ৯০ মাইল গতিতে ছুটছিল। আল্লাহর রহমতে আমরা পল্টি খাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাই।

পেছনে তাকিয়ে দেখি, ডিবিসি নিউজের গাড়িটিকে দুর্বৃত্তরা আটকে ফেলেছে। তৎকালীন ফেনীর ছাত্রলীগ নেতার নেতৃত্বে এই হামলাগুলো হয়েছিল। “৭১” সহ আরও অসংখ্য গাড়িতে হামলা চলেছিল গণহারে। ফেনীর একটি বাজারে সমস্ত সাংবাদিকদের গাড়ি থামানো হয়। সহকর্মী আপন ভাইয়ের কান ফেটে যায়, রক্তক্ষরণ হচ্ছিল অবিরত। তাকে চিকিৎসা করিয়ে আমরা আবার রওনা দিই কক্সবাজারের পথে।

পথে নানান বাধা, ছোটখাটো দুর্ঘটনা পেরিয়ে আমরা পৌঁছাই চট্টগ্রামে। যাত্রাবিরতির পর আবার রওনা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। পথে পথে হামলা চললেও মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। রাতের অন্ধকারেও মানুষ দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানাচ্ছিল। দলীয় নেতাকর্মীরা নানা হয়রানি, হামলার আশঙ্কা সত্ত্বেও তাকে নিরাপদে পৌঁছাতে কাজ করে গেছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে।

পথিমধ্যে আমাদের গাড়ির বাম্পার ভেঙে যায়, তবুও আমরা চলতে থাকি। যদিও বেগম জিয়ার বহরে হামলা শুরু হয়েছিল নারায়ণগঞ্জে, পরে কাচপুর থেকে সারারাস্তায় বিচ্ছিন্নভাবে। পরের দিন তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত মানুষের পাশে থাকার একাত্মতা জানান।
আমরা তখন জ্যামে আটকে, ফেরার পথে দেখা হয় রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিয়ে কাজ করা দুই সহকর্মীর সঙ্গে। তারা আমাদের অকেজো ক্যাবলটি রেখে যান, সেটাই দিয়ে কোনোভাবে ঢাকায় ফেরার যাত্রা শুরু করি।

কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পথে আবারও ফেনী—আবারও হামলা।
বেশ কিছু গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে, প্রায় ৪০-৫০টি গাড়ি একসাথে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আহত হন অসংখ্য নেতা ও কর্মী। আমরা পিছনে ছিলাম—ঘটনার চিত্র ধারণ করতে করতে সামনে এগোচ্ছিলাম। ঠিক ফেনী শহর পার হওয়ার সময় বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ির দুই পাশে অসংখ্য ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। আমরা তখন লাইভে ছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্য—অডিও বারবার ছিঁড়ে যাচ্ছিল, কারণ কেবলটি নষ্ট।

লাইভ চলতে চলতে আমাদের গাড়ির তেল ফুরিয়ে যায়। বেগম জিয়ার বহরকে তখন ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। কাছের একটি পেট্রোল পাম্পে দেখা হয় আব্দুল্লাহ আল মিন্টু সাহেবের সঙ্গে—তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার প্রতিক্রিয়া জানান। এভাবেই শেষ হয় সেই যাত্রা, যা আজও মনে করিয়ে দেয় ভয়াবহ স্মৃতি আর দায়িত্বের চরম মুহূর্ত।


আরেক ২৮ অক্টোবর — ২০২৩ সালের নয়া পল্টনের বিভীষিকা

২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর আমি আবার সময় টিভিতে ফিরি।
আর ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর—নয়া পল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ চলাকালে শুরু হয় ভয়াবহ সংঘাত।
আমি তখন একটি দশতলা ভবনের ছাদে। নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেছে। দূরে মালিবাগের দিক থেকে শব্দ শুনতে পাচ্ছি, যোগাযোগ করতে পারছি না। অবশেষে স্ত্রী জানালেন—সংঘাত শুরু হয়েছে।

ছাদ থেকে নিচে নামতে যাই, দেখি দরজা বাইরে থেকে লক করা। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেও লাভ হলো না। জানালার ফাঁক দিয়ে পাশের বিল্ডিংয়ের বাথরুমের ছাদে ট্রাইপড আর ক্যামেরা রেখে দেয়ার পর দুই দেয়াল ধরে নেমে যাই নিচে। তারপর আবার ১২-১৩ ফিট নিচে লাফ দিই—হাতে চামড়া উঠে যায়। সহকর্মী আহমেদ সালেহীন তখন গাড়িতে। তাকে বললাম, “চলো, বের হয়ে যাই—কিছু একটা হচ্ছে।” সে হেসে বলে, “মামা, দেখি কী হয়!”

মঞ্চের সামনে ছিলেন রেজাউল হক রিপন ভাই ও আফজাল ভাই। বিএনপি অফিসের উল্টো পাশে ছাদে ছিলেন নুরুল ইসলাম নয়ন ভাই। নেটওয়ার্ক বন্ধ, যোগাযোগ সম্ভব নয়। আমি আর সালেহীন এগিয়ে যাচ্ছি নয়া পল্টন মোড়ের দিকে—তখনই ভয়াবহ ফায়ারিং শুরু হয়।
কাকরাইল থেকে রাজমনি ইসাকা হোটেল পর্যন্ত গুলি, ট্রিয়ার সেল, সাউন্ড গ্রেনেড—পুরো এলাকা যেন যুদ্ধক্ষেত্র। স্কাউট ভবনের পাশে দাউদাউ করে আগুন, মোটরসাইকেল জ্বলছে। তখন এক বুলেট এসে লাগে আমার বাম চোখের নিচে। হেলমেট থাকা সত্ত্বেও মুখে বিদ্ধ হয় বুলেটটি।

পুলিশ সামনে এগিয়ে আসছে, অত্যাধুনিক এপিসি থেকে গুলি ছুড়ছে। বিএনপি নেতা-কর্মীরা প্রাণপণ প্রতিরোধ করছে। পেছনে গেলে ইটপাটকেলের আঘাত, সামনে গেলে গুলি—চারদিকেই বিপদ।
ঠিক তখনই এক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তার দয়ায় আমরা ট্রাস্ট ব্যাংকের ভবনে আশ্রয় পাই। চারদিক ধোঁয়ায় ভরা, নিঃশ্বাস নেয়া কঠিন। পাশের বিল্ডিং থেকে কেউ পানির বোতল ছুঁড়ে দেয়, কেউ বিরিয়ানির প্যাকেট দিয়ে সাহায্য করে। ওই কর্মকর্তার সহায়তা আর মহান সৃষ্টিকর্তার রহমতে আমরা সেদিন বেঁচে যাই।

ঘণ্টাখানেক পর নয়া পল্টন ক্লিয়ার হয়। আমরা ছাদ থেকে নামি।
রক্ত থেমে গেছে, কিন্তু মুখে থাকা বুলেটের যন্ত্রণা তীব্র। মুখ খুলতে পারছি না। সন্ধ্যায় রিপন ভাইয়ের কাছে ধরা পড়ে যাই—তখনই সবাই জানতে পারে, আমি মুখে বুলেট খেয়েছি।


শেষ কথা

২৮ অক্টোবর তাই আমার কাছে এক বিশেষ দিন।
কখনো কষ্টের, কখনো বেদনার, কখনো ভয় আর আশঙ্কার—আবার কখনো দায়িত্ব আর বেঁচে ফেরার আনন্দের দিন।

— মিজানুর রহমান গণমাধ্যম কর্মী সময় টিভি
২৮ অক্টোবর ২০২৫