কেন এনসিপি গণপরিষদ ছাড়া নির্বাচন চায় না?
জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP) তাদের প্রতিষ্ঠার পর থেকে গণপরিষদ নির্বাচন এবং একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের উপর জোর দিয়ে আসছে। তারা মনে করে, একটি সাধারণ নির্বাচনের আগে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। তাদের এই অবস্থানের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:
- বর্তমান সংবিধানের প্রতি অনাস্থা: এনসিপি মনে করে, বর্তমান সংবিধান যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি একটি “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের পাঠ্যপুস্তক” হয়ে উঠেছে। ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, এই রাষ্ট্রব্যবস্থা অকার্যকর। তাই জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বমূলক একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটি নতুন সংবিধান অপরিহার্য।
- সংস্কারের অগ্রাধিকার: এনসিপি-র প্রধান অগ্রাধিকার হলো জুলাই সনদ (গণঅভ্যুত্থানের ফলে প্রাপ্ত দাবিগুলো) বাস্তবায়ন করা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার করা। তারা মনে করে, এই সংস্কারগুলো ছাড়া কোনো সাধারণ নির্বাচন অর্থহীন হবে, কারণ তা কেবল “মধ্যরাতের ভোটের পুনরাবৃত্তি” ঘটাবে।
- নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার অভাব: এনসিপি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং তাদের পদত্যাগ দাবি করেছে। তারা মনে করে, বর্তমান কমিশনের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। একটি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে তাদের ফিটনেস পরীক্ষা করার দাবিও জানিয়েছে তারা।
- ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণ রোধ: দলটি একটি নতুন সংবিধানের মাধ্যমে ক্ষমতা বিভাজন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ‘একনায়কতান্ত্রিক’ শাসন পুনরায় ক্ষমতায় আসতে না পারে। তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সীমাহীন ক্ষমতা থাকারও বিরোধী।
- জনগণের প্রকৃত বিকল্প তৈরি: এনসিপি আসন ভাগাভাগির রাজনীতি বা সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী নয়। তারা জনগণের সামনে একটি প্রকৃত বিকল্প উপস্থাপন করতে চায়, যেখানে প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকবে এবং রেফারি (নির্বাচন কমিশন) শুধু রেফারি হিসেবেই কাজ করবে, খেলোয়াড়ে পরিণত হবে না। তারা চায় জনগণ যদি তাদের প্রত্যাখ্যানও করে, তবে সেটা যেন একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হয়, কোনো সমঝোতার নির্বাচনের মাধ্যমে নয়।
- গণতান্ত্রিক বৈধতা: একটি গণপরিষদ নির্বাচন-এর মাধ্যমে প্রণীত নতুন সংবিধানকে তারা আরও বেশি গণতান্ত্রিক ও বৈধ মনে করে, কারণ এটি সরাসরি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত হবে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে।
সংক্ষেপে, এনসিপি মনে করে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট এতটাই গভীর যে, কেবল একটি সাধারণ নির্বাচন করে এর সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য একটি মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, যা একটি গণপরিষদ দ্বারা নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।





